খড়গপুরে গত কয়েকদিন ধরে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে শহরের রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ—সকলের মধ্যেই কৌতূহল ও চর্চা বেড়েছে। রেল শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে হঠাৎই পড়ে থাকা পোস্টার ঘিরে মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা প্রশ্ন। কারা দিল, কেন দিল—উত্তর মিলছে না কোনও দিক থেকেই। তবে এই পোস্টার রহস্য রাজনীতিতে যে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
দ্বিতীয় দিনেও শহরের পথে-ঘাটে সেই পোস্টার যেমন দেখা গেছে, তেমনি ক্রমে সামনে এসেছে অভিযোগের ঝড়ও। জানা যাচ্ছে, পোস্টারে সরাসরি নাম করে অভিযোগ তোলা হয়েছে খড়গপুর সদরের বিধায়ক ও অভিনেতা হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। অভিযোগ—আইআইটির শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হাসপাতালে নাকি টাকার বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয়। আরও বিস্ময়কর বিষয়, পোস্টারে লেখা রয়েছে আইআইটি কর্তৃপক্ষ ও হিরণের মধ্যে ‘গোপন আঁতাত’-এর কথাও। পোস্টারের নিচে বড় করে থাকা ‘ভারত মাতার জয়’ শব্দবন্ধ জল্পনাকে আরও গভীর করেছে। ফলে কোন রাজনৈতিক মহল থেকে এই পদক্ষেপ—সেটা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ঘটনার পেছনে একাধিক দিক থাকতে পারে। বিজেপি শিবিরেরই কিছু নেতা খোলাখুলি বলছেন, বহুদিন ধরেই হিরণকে নিয়ে অন্দরে ক্ষোভ জমে ছিল। অভিযোগ—বিধায়ককে এলাকায় ঠিকমতো দেখা যায় না, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না, এমনকি তাঁর নিজের ওয়ার্ডেও পানীয় জলের সমস্যা মেটেনি। কারও কারও মতে, এই অসন্তুষ্টির জেরেই দলের মধ্যেকার কোনও গোষ্ঠী এই ধরনের পোস্টারিং করতে পারে। আবার বিজেপিরই একটি অংশের দাবি—তৃণমূল ফাঁদ পেতেই এই কাণ্ড ঘটাতে পারে। ফলে দোষারোপের পালা চললেও স্পষ্ট কোনও দিশা মিলছে না।
এদিকে হিরণ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য কোনও পাল্টা অভিযোগে না গিয়ে হাস্যরসেই পরিস্থিতিকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মন্তব্য—“যে করেছেন, খুব ভালো করেছেন। এতে আমার জনপ্রিয়তা আরও বাড়ছে। আরও পোস্টার লাগুক।” তাঁর এই মন্তব্যের পরেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—তাহলে কি সত্যিই দলের মধ্যে ক্ষোভ এতটাই গভীর যে বিধায়ককেও তা টের পেতে হচ্ছে? কারণ, খড়গপুরে বিজেপির উত্থান শুরু হয়েছিল দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বে, আর তিনি সাংসদ হওয়ার পরই হিরণ বিজেপি প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছিলেন। ভোটে জেতার পর থেকেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এলাকার মানুষের ক্ষোভ।
আরও পড়ুনঃ ‘রাজভবনে অপরাধীদের রাখছেন রাজ্যপাল, বোমা–বন্দুক দিচ্ছেন’—কল্যাণের বিস্ফোরক অভিযোগে উত্তপ্ত রাজ্য, পাল্টা রাজভবনের প্রশ্ন—‘প্রমাণ না পেলে ক্ষমা চাইবেন তো?’
তৃণমূল অবশ্য সুযোগ ছাড়েনি। মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সুজয় হাজরা তোপ দেগে বলছেন—বিজেপি মানেই দুর্নীতি। তাঁর দাবি, “হিরণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিজেপির নিজের লোকজনই। দলটা ভেঙে পড়ছে বলেই নিজেদের মধ্যে বাজার গরম রাখতে এমন কাণ্ড ঘটছে।” সব মিলিয়ে পোস্টার কাণ্ড শুধু বিতর্কই নয়, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রেল শহরের রাজনীতি কোনদিকে মোড় নেবে—সেটাই এখন দেখার।





