গরম পড়তেই রাজ্য রাজনীতি ফের উত্তপ্ত। ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে বাড়তে শুরু করেছে উত্তেজনা। বছরের পর বছর ধরে বাংলার মাটিতে নানা উৎসব ঘিরে ধর্মীয় আবেগে গা ভাসিয়ে থাকেন সাধারণ মানুষ। তবে এবারে সেই আবেগের সঙ্গেই জুড়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক পারদ। একদিকে উৎসবের আনন্দ, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপানউতোর— সব মিলিয়ে রামনবমী (Ram Navami) ঘিরে রাজ্যের একাধিক জেলায় শুরু হয়েছে তৎপরতা। কোথাও ধর্মীয় মিছিল, কোথাও আবার অস্ত্র নিয়ে শোভাযাত্রা।
রামনবমী মানেই হিন্দু ভাবাবেগের উৎসব। আর সেই উৎসবকে ঘিরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে তৈরি হয়েছে নতুন চিত্র। ঢাক, কাঁসর, শঙ্খ, ঢোলের তালে মেতে উঠছে ছোট থেকে বড় সবাই। তবু এর মাঝেই কোথাও যেন লুকিয়ে আছে এক অজানা আতঙ্ক। কারণ শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, রামনবমী নিয়ে রাজনৈতিক লড়াইও তুঙ্গে। এবার রাজ্য জুড়ে রামনবমী পালিত হবে বড়সড় আয়োজনের মধ্য দিয়ে। মিছিল, শোভাযাত্রা, অস্ত্র মিছিল— সব কিছুই রয়েছে তালিকায়। এই অবস্থায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশাসনের মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
নজরদারি আরও কড়া, ২৯ জন আইপিএস অফিসারের উপর বিশেষ দায়িত্ব
রাজ্য সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে, এবারে রাজ্যজুড়ে আড়াই হাজারেরও বেশি মিছিল বের হবে রামনবমীর (Ram Navami Procession) দিন। কলকাতা এবং হাওড়া মিলিয়ে আবেদন পড়েছে ৮০টিরও বেশি মিছিলের জন্য। তাই অশান্তি ঠেকাতে বিশেষ তৎপর হয়েছে পুলিশ প্রশাসন। গোটা রাজ্যে ২৯ জন আইপিএস অফিসারকে বিশেষ নজরদারির দায়িত্বে রাখা হয়েছে। শিশুদের হাতে অস্ত্র রয়েছে কিনা তা দেখার জন্য থাকছে শিশু সুরক্ষা কমিশনের পর্যবেক্ষণও। ইতিমধ্যেই পুলিশ কমিশনাররা সংগঠকদের সঙ্গে বৈঠক করে নিয়মাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে শান্তিপূর্ণ মিছিল করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বড় বড় মিছিলের রুটে থাকছে অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন নজরদারি, এমনকি পুলিশের বডি ক্যামেরাও থাকবে প্রতিটি পদক্ষেপ নজরবন্দি করতে।
অস্ত্র হাতে মিছিল! বিজেপি-র বিরুদ্ধে তৃণমূলের অভিযোগ
রামনবমীর আগে থেকেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে বিজেপি (BJP) নেতৃত্ব একাধিকবার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন অস্ত্র নিয়ে মিছিল করার কথা। দিলীপ ঘোষ থেকে শুভেন্দু অধিকারী, হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বাধা পেলেও মিছিল আটকে রাখা যাবে না। শনিবার সাঁকরাইলের (Sankrail) রাজগঞ্জ গঙ্গার ঘাট থেকে অস্ত্র হাতে বিশাল মিছিল বেরিয়েছে সিংহ বাহিনী সংগঠনের উদ্যোগে। ৫-৬ কিলোমিটার ধরে চলেছে এই অস্ত্র মিছিল। এর বিরুদ্ধেই সরব তৃণমূল (TMC) নেতৃত্ব। রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, “রামনবমী কি শুধু বিজেপির উৎসব? কেন শুধু এই দিনেই অশান্তির ছবি দেখা যায়?” বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) এবং বজরং দলের (Bajrang Dal) উদ্যোগে মিছিল হলেও মূলত বিজেপি কর্মী-সমর্থকরাই অংশ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ তাঁর।
রাজভবনের সতর্ক বার্তা, পুলিশের কড়া ব্যবস্থা
রামনবমী (Ram Navami) ঘিরে রাজ্য সরকারের পাশাপাশি রাজভবন থেকেও সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়েছে। রাজভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব পালনের জন্য পুলিশকে কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজভবনে চালু হয়েছে বিশেষ পিস রুম। অন্যদিকে, হাওড়া জিটি রোডে মিছিলের উপর নজর রাখতে থাকবে ১০টি ড্রোন। প্রতিটি বড় মিছিলের রুটে থাকবে অতিরিক্ত পুলিশ এবং আধিকারিকদের নজরদারি। পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, কোনও অবস্থাতেই আইন অমান্য সহ্য করা হবে না। মিছিলে অস্ত্র থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেল পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, ট্রেনে অস্ত্র বহন করলে গ্রেফতার করা হবে।
আরও পড়ুনঃ Weather update : অবশেষে স্বস্তির খবর! এপ্রিলের শুরুতেই ঝড়-বৃষ্টির আগমন, কি জানাচ্ছে হওয়া অফিস ?
এক সপ্তাহ জুড়ে কর্মসূচি, শুভেন্দুর হুঁশিয়ারি
এদিকে, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) রামনবমীকে সামনে রেখে টানা এক সপ্তাহ কর্মসূচি পালন করবেন বলে জানিয়েছেন। শনিবারই তিনি রানাঘাটের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। আবার কলকাতায় ৪৩টি মিছিলের আয়োজন করেছে গেরুয়া শিবির। যদিও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপি (ABVP)-র রামনবমী পালনের আবেদন নাকচ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে রামনবমীকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে নজরদারি, অস্ত্র নিয়ে রাজনীতি, বিজেপি-তৃণমূলের তরজা— সবকিছুই এবার রামনবমী উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। একদিকে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনা— এই দুইয়ের দ্বন্দ্বেই কাটবে আগামী কয়েকটা দিন।





