ছেলে সরকারি চাকরি করে, বয়স্ক মা ট্রেনে বাদাম চিপস পাপড় বিক্রি করে। হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন। হাতের শাখা পলা শিশুদের সিঁদুর পরা এই বাঙালি বৃদ্ধা একজন সরকারি কর্মচারীর মা। সরকারি চাকরি করা ছেলে মা বাবাকে ছেড়ে চলে গেছে। তাই অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার খরচ ও দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগাড় করতে পথে নামতে হয়েছে বৃদ্ধাকে। হাওড়া থেকে হুগলি গামে লোকাল ট্রেনের প্রতি তিনি এভাবে বাদাম চাক, চিপস পাপড় বিক্রি করেন এই বয়স্ক ভদ্রমহিলা। তবে এই দুর্ভাগ্যজনক জীবনের কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় সকলের সামনে তুলে ধরেছেন একজন ডাইহার্ট মোহনবাগান ফ্যান। ওই মোহনবাগান সমর্থকের নাম সুরজিৎ মজুমদার। দুপুরবেলা গরমে অফিস থেকে ফেরার সময় ট্রেনে এই মহিলার সাথে দেখা হয় সুরজিৎ এর।
সুরজিৎ বাবু নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বৃদ্ধার কথা লিখে জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “আজ দুপুরে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছি, লিলুয়া ছাড়ার পর এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা। আগেও অনেক বার এঁকে ট্রেনে দেখেছি, আমার স্ত্রী-ও চেনেন এঁকে। আমাদের লাইনে বাদাম চাক, চিপস, পাঁপড় এইসব বিক্রি করেন, আমি নিয়েওছি বেশ কয়েকবার। চেহারাতেই বোঝা যায় ভালো ঘরের, হাতে শাঁখা পলা, সিঁথিতে সিঁদুর। আজ ওঁকে পাশে বসিয়ে আলাপ করলাম, ইনিও বসে গেলেন কারণ যে ক’টা বাদাম চাকতি ছিলো সবকটা আমিই কিনে নিয়েছিলাম। বিভিন্ন কথার মাধ্যমে যা জানতে পারলাম তা হল এঁর বাড়ি রিষড়া, বাড়িতে ইনি আর অসুস্থ স্বামী। ছেলে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে বহুদিন আগেই, তারা অন্য জায়গায় থাকে, আবার ছেলে নাকি সরকারি চাকরি করে! স্বামী জয়শ্রী টেক্সটাইলে কাজ করতেন, সব টাকা সন্তান দের বড় করতে খরচ করে ফেলেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম “এই বয়সে এত গরমে ট্রেনে ঘুরে ঘুরে ফেরি করছেন, ছেলে টাকা পয়সা দেয় না?”
উনি হাসিমুখেই বললেন “দিলে কি আর এত কষ্ট করতাম? তা ছাড়া আমার দিনে পুঁজি নিয়ে দুশো টাকা হলেই হল, ডাল ভাত এতেই হয়ে যায়।” লিলুয়া থেকে রিষড়া পর্যন্ত কথা হল, কিন্ত কোনো অভিযোগ করলেন না, ছেলেকে দোষারোপ-ও না। আমি শুধু ভাবছিলাম মানুষের মত স্বার্থপর প্রাণী আর দুটো নেই, নিজেরটা গোছানো হয়ে গেলে সে আর কাউকে চেনে না।”
এই বয়স্ক ভদ্রমহিলা নিজের সারা জীবন ধরে যে ছেলে মেয়েকে বড় করে তুললেন সেই ছেলেমেয়েরাই শেষ বেলায় মুখ ফিরিয়ে নিল। বয়স্ক মাকে পথে নামিয়ে দিল। তা সত্ত্বেও সেই বয়স্ক মায়ের কোন অভিযোগ নেই ছেলেমেয়েদের নিয়ে।
ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের তুমুল গরম পড়তে শুরু করেছে আর কিছুদিন বাদে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। সেই গরমেও এই বয়স্ক ভদ্রমহিলা ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়াবেন দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগাড় করতে। যদি কোনভাবে এই বয়স্ক ভদ্রমহিলার ছেলে মেয়ের কাছে খবরটি পৌঁছয় তবে একটাই কথা প্লিজ আর পাপ করবেন না। দুদিন বাদে আপনাদের সন্তানরা যখন আপনাদের এরকম ভাবে পথে নামিয়ে দেবে। তখন কার কাছে প্রার্থনা করবেন?






