বিধানসভার বহুচর্চিত সই-বিতর্ককে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়াল। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ বিধানসভার বিতর্কিত সই-সংক্রান্ত অভিযোগের সূত্রপাত হয়েছিল এই দুই বিধায়কের লিখিত অভিযোগ থেকেই। মুখ্যমন্ত্রী সেই তথ্য প্রকাশ্যে আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই দলের তরফে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।
সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, বিধানসভার সই-কাণ্ড নিয়ে স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন তৃণমূলেরই দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই বিধানসভার সচিবালয় হেয়ার স্ট্রিট থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। পরবর্তীতে বিষয়টি রাজ্য প্রশাসনের নজরে আসার পর তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপনকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত তাঁদের ইমেল ও হোয়াটসঅ্যাপ মারফত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুকেও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
বহিষ্কারের পর দুই বিধায়কের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সন্দীপন সাহা প্রকাশ্যে অভিযোগ করে বলেন, যারা অনৈতিক কাজ করে দল তাদের রক্ষা করছে, অথচ যারা নীতিগত অবস্থান নিয়েছে তাদেরই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, বিধায়কদের যে সই করানো হয়েছিল, সেটি হাজিরা খাতার জন্য বলে জানানো হয়েছিল, পরে সেটিকেই অন্যভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বহিষ্কারের ফলে বিধানসভায় দুই বিধায়কের অবস্থান এখন সম্পূর্ণ আলাদা হবে। তাঁরা কার্যত ‘দলহীন’ বিধায়ক হিসেবে গণ্য হবেন এবং ভবিষ্যতে কোনও ভোটাভুটি বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় দলীয় হুইপ মানতে বাধ্য থাকবেন না। একই সঙ্গে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় তাঁদের বিরুদ্ধে পদ খারিজের আবেদনও সহজে করা যাবে না। উল্লেখযোগ্যভাবে, ঋতব্রতের রাজনৈতিক জীবনে এমন অভিজ্ঞতা নতুন নয়। অতীতে সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ থাকাকালীন তিনিও দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় নির্দল সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এই ঘটনার পর দলের ভেতরেও চাপা অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। বেলেঘাটার বিধায়ক ও তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ সামাজিক মাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট করে নাম না করেই দুই বিধায়ককে কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্যে দলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়াকে বিশ্বাসঘাতকতা ও কাপুরুষতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তার সমাধান দলের ভেতরে থেকেই খোঁজা উচিত। অন্যদিকে, সই-কাণ্ড ঘিরে তদন্তও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। ইতিমধ্যে সিআইডি একাধিক বিধায়কের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং কয়েকজনের বাড়িতেও গিয়েছে। তদন্তের আওতায় এসেছেন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, তাপস মাইতি ও বাহারুল ইসলাম। বিশেষ করে বাহারুল ইসলামের সই নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর দাবি, যে তারিখের নথিতে তাঁর স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে, সেই দিন তিনি বৈঠকেই উপস্থিত ছিলেন না।
আরও পড়ুনঃ মীরা ‘মা’ ডাকলেই সেদিন হবে মাতৃদিবস! অবশেষে মেয়ের মুখে শোনা গেল সেই শব্দ, অপেক্ষার অবসানে আবেগে ভাসলেন অহনা দত্ত! কী বললেন অভিনেত্রী?
গোটা বিতর্কের সূত্রপাত মূলত বিরোধী দলনেতা, উপদলনেতা ও মুখ্যসচেতক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ভোটের ফল প্রকাশের পর তৃণমূল বিধায়কদের বৈঠকে এই দায়িত্ব দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। পরে দলের তরফে নির্দিষ্ট কয়েকজনের নাম বিধানসভায় পাঠানো হলেও পরিষদীয় নিয়মের জটিলতায় তা গৃহীত হয়নি। এরপর দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বিধায়কদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের সন্দেহ, পরবর্তী সময়ে সেই স্বাক্ষরগুলিকে পূর্ববর্তী তারিখের কার্যবিবরণীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই সই-বিতর্কের সূত্রেই সিআইডি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তলব করেছিল। যদিও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি নির্ধারিত দিনে হাজিরা দেননি। ফলে তদন্তের অগ্রগতি এবং বহিষ্কৃত দুই বিধায়কের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান দুই নিয়েই এখন রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র কৌতূহল তৈরি হয়েছে।






