দল-মত নির্বিশেষে রাজনীতির কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা শুধুই নেতা নন—একটা সময়ের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। নদিয়ার তেহট্টে এমনই এক নাম ছিল তৃণমূল বিধায়ক তাপস সাহা। পাড়ার মোড়ে, বাজারে কিংবা জনসভায়—সব জায়গায় তাঁর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত হাসিখুশি মুখের মানুষটি সকলের সঙ্গে কথা বলতেন নির্দ্বিধায়। অথচ আজ, তাঁর শূন্যতা যেন ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন খবর পাওয়ার পর চায়ের কাপটা হাতে নিয়েই থমকে গিয়েছেন বহু মানুষ। যাঁর বিরুদ্ধে একসময় অভিযোগ উঠলেও, ব্যক্তিগত ভাবে অনেকেই তাঁর পাশে ছিলেন। “তাপসদা চলে গেল! বিশ্বাস করতে পারছি না!”—এমন প্রতিক্রিয়া মিলছে রাজনৈতিক সমর্থকদের মুখে তো বটেই, বিরোধীদের কাছ থেকেও। হঠাৎ এমন বিদায়ে যেন স্তব্ধ গোটা তেহট্ট।
জানা গিয়েছে, বুধবার সকালে হঠাৎ করেই শরীর খারাপ অনুভব করেন তাপসবাবু। নিজের বাসভবনেই ঘটেছিল ঘটনাটি। পরিবার ও ঘনিষ্ঠরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ে যান স্থানীয় মহকুমা হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষা করে জানান, তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিস্থিতি গুরুতর দেখে দ্রুত তাঁকে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অবস্থা বুঝে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে। তখনও কেউ ভাবেননি যে বিষয়টা এতটা ভয়ানক হয়ে উঠবে। চিকিৎসকদের দল নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল—তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্য।
কলকাতার ওই নার্সিংহোমে রাতভর চিকিৎসা চলার পর অবশেষে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ১৫ মিনিট নাগাদ মৃত্যু হয় তাপস সাহার। বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। শেষবারের মতো হাসপাতাল চত্বরে বেরিয়ে আসা সেই নিঃশব্দ স্ট্রেচার দেখে বহু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, সহকর্মীর চোখে জল এসে যায়। রাজনৈতিক মহলে নেমে আসে শোকের ছায়া। মুখ্যমন্ত্রী সহ একাধিক তৃণমূল নেতৃত্ব শোকপ্রকাশ করেছেন। তেহট্টে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা নামানো হয় অর্ধনমিত করে।
রাজনৈতিক কেরিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও পিছু নিয়েছিল তাপসবাবুকে। নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল। অভিযোগ ছিল, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়া হয়েছিল। সিবিআই-এর জিজ্ঞাসাবাদেও তাঁকে হাজিরা দিতে হয়েছিল। এমনকি, কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকরা একসময় তল্লাশি চালান তাঁর তেহট্টের বাড়িতে। পুকুরপাড় থেকে পোড়া নথি উদ্ধার হয়েছিল, যা নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল তৎকালীন সময়ে। তদন্তের স্বার্থে সেগুলি পরীক্ষার জন্য পাঠানোও হয়েছিল। সেদিন ১৫ ঘণ্টার তল্লাশির পরে তিনি নিজেই এলাকার মানুষকে ডেকে মাংস-ভাত খাইয়েছিলেন—এক অনন্য বার্তা দিয়ে। কিন্তু আজ সেই দৃঢ় স্বভাবের মানুষটিই আর নেই।
আরও পড়ুনঃ Weather update : ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস রাজ্যবাসী! এরই মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টি আসছে, সতর্কতা কলকাতা-সহ একাধিক জেলায়!
দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও, একাধিক সাধারণ মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন—তাপসবাবু “হার্ডকোর রাজনীতির” মধ্যেও সহজ জীবনযাপন করতেন। তাঁর মৃত্যু শুধু এক রাজনৈতিক প্রতিনিধির প্রয়াণ নয়, বরং এক সময়ের অবসান। পেছনে থেকে গেল বিতর্ক, তদন্ত, শাসনের পালাবদল—সবকিছু। আজ তাপস সাহা নেই, আছে শুধুই স্মৃতি।





