Radha Govind Kar: আর জি কর কাণ্ডে (RG kar college and hospital) উত্তাল হয়ে আছে সারা বাংলা। রাজ্যের গন্ডি পেরিয়ে দেশ এবং দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলার তিলোত্তমার ন্যায় বিচারের দাবি। সাধারণ মানুষ থেকে তারকারা রাস্তায় নামছেন প্রতিবাদ করে, কিন্তু যে আর জি কর আজ সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে উঠেছে, সেই আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনেকেরই অজানা। রাধা গোবিন্দ কর (Radha Govind Kar) ছিলেন একজন বিলেত ফেরত ডাক্তার হয়েও গ্রামের মানুষদের অকাতরে সেবা করেছেন।
নির্হঙ্কারী এই মানুষটি সাইকেল চালিয়ে বেলগাছিয়া-দমদম পর্যন্ত লোকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যেতেন সেবা করবার জন্য, এমনকি বেশিরভাগ রোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তাদের ওষুধ কেনার টাকাটাও তিনি দিয়ে দিতেন। ১৮৯৯ তে যখন কলকাতাতে প্লেগ মহামারী রূপে দেখা দিল তখন ভগিনী নিবেদিতার সাথে রাধা গোবিন্দ কর একসাথে মহামারীতে মানুষের সেবা করে গিয়েছেন। সেই সময় তাকে চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্যতম রেনেসাঁ পুরুষ বলা হতো।
১৮৮০ তে কলকাতা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসাবিদ্যার পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৮৮৩তে স্কটল্যান্ডে পাড়ি দেন ও চিকিৎসা বিদ্যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডিগ্রি এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৮৮৬তে। সেই সময় বাংলায় চিকিৎসা বিদ্যার কোনও বই ছিল না। এই সমস্যার সমাধান করতে বাংলা ভাষায় বই লিখেছিলেন তিনি। বই লেখার সময় থেকেই তার মনের মধ্যে সুপ্ত বাসনা ছিল, সাধারণ মানুষদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য একটি হাসপাতাল তৈরি করার।
কিন্তু হাসপাতাল তৈরি করতে বিপুল অর্থ লাগবে ভেবে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের সমস্ত কিছু বিক্রি করে দেবেন এবং প্রয়োজনে অর্থ যোগাড় করতে ভিক্ষা করবেন। সেই সময় তিনি তৎকালীন সমস্ত ধনী ব্যক্তিদের থেকে হাসপাতাল তৈরি করবার জন্য অর্থ সাহায্য চাইতে শুরু করেন এবং সেই সময় কোন অভিজাত ধনী পরিবারে বিয়ের অনুষ্ঠান হলে তিনি বিয়ের গেটে উপস্থিত থেকে আমন্ত্রিতদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য চাইতেন হাসপাতাল তৈরি করার জন্য।
বিলেত ফেরত একজন ডাক্তার হাসপাতাল তৈরি করবার জন্য মানুষের কাছ থেকে এইভাবে হাত পেতে ভিক্ষা চাইছেন বিষয়টি নিয়ে অনেক সমালোচনা হলেও এই দেশের বেশিরভাগ মানুষই তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর রাধাগোবিন্দ কর নিজে চিকিৎসা করে যা কিছু অর্জন করেছিলেন সবই দান করে দেন মেডিকেল কলেজকে। এইভাবে অর্থ সংগ্রহ করে এবং নিজের যাবতীয় সম্বল বিক্রি করে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি বেলগাছিয়ায় ১২ বিঘা জমি কিনে তৈরি করেন হাসপাতাল।
এই হাসপাতাল তৈরি করতে খরচ হয়েছিলো ৭০ হাজার টাকা। সেইসময় ঐ হাসপাতাল পরিদর্শন করতে এসে ১৮০০০ টাকা দান করেছিলেন স্বয়ং প্রিন্স অ্যালবার্ট ভিক্টর। এই সময় হাসপাতালের নাম রাখা হয়েছিল অ্যালবার্ট ভিক্টর হাসপাতাল, এরপর ১৯০৪ সালে রাধা গোবিন্দের এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয় কলেজ অফ ফিজিশিয়ান এবং সার্জেন অফ বেঙ্গল। এরপর ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের পর বেলগাছিয়া মেডিকেল কলেজের আত্মপ্রকাশ হয়।
১৯১৬ সালের ৫ই জুলাই এই মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতল ভবনের উদ্বোধন করেন লর্ড কারমাইকেল, তখন এর নাম বদলে হয় কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ। স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত এই নামই ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য স্বাধীনতার আগে, ১৯১৮ সালের ১৯শে ডিসেম্বর ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাধা গোবিন্দ কর। মৃত্যুর সময় তার নিজের বলতে ছিল বেলগাছিয়ায় একটি বাড়ি,তবে সেই বাড়িটিও মেডিকেল কলেজকে দান করে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে স্বনামধন্য ডাক্তার রাধাগোবিন্দ করের নামেই হাসপাতালের নাম হয় আর জি কর মেডিকেল কলেজ।





