প্রথমে লাঠি, তারপর গদা, এবার দা! বাংলার রাজনীতিতে প্রতীকী অস্ত্রের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। কখনও তা রক্ষণশীলতার প্রতীক, কখনও তা প্রতিরোধের বার্তা দেয়। তবে যখন কোনও নেতা জনসমক্ষে ধারালো অস্ত্র হাতে তুলে নেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগতে বাধ্য। সম্প্রতি বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষকে এক মেলায় হাতে দা নিয়ে ঘুরতে দেখা গিয়েছে। এটা নিছকই গৃহস্থালির সামগ্রী কিনতে গিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে কোনও রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে রয়েছে—সেই নিয়েই এখন রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে।
দিলীপ ঘোষের রাজনৈতিক কেরিয়ারের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি বরাবরই আক্রমণাত্মক ভাবমূর্তির নেতা। একসময় তাঁকে লাঠি হাতে দেখা গিয়েছে, কখনও বা গদা হাতে নিয়ে রাজনৈতিক সভায় বক্তব্য রেখেছেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল দা। আর সেটা কিনলেন এমন সময়, যখন রামনবমী আসন্ন! তাই প্রশ্ন উঠছে, এই দা কি নিছকই ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য, নাকি এর মধ্যে রয়েছে কোনও সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ইঙ্গিত?
ঘটনাটি ঘটেছে পূর্ব বর্ধমানের অগ্রদ্বীপে, যেখানে প্রতি বছর গোপীনাথ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার দুপুরে বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য কৃষ্ণ ঘোষের বাড়িতে যান দিলীপ ঘোষ। সেখান থেকে গোপীনাথ মন্দিরে পুজো দেন। মেলা চত্বরে কিছুক্ষণ কর্মীদের সঙ্গে জনসংযোগ করার পর ফেরার পথে এক দোকানের সামনে দাঁড়ান। দোকানে লোহার বঁটি, দা, শাঁড়াশি, হাতা, খুন্তি বিক্রি হচ্ছিল। দোকানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখার পর একটি ধারালো দা কিনে ফেলেন তিনি। দাম মাত্র ১৫০ টাকা! সাংবাদিকরা যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন, কেন এই দা কেনা, তখন তিনি বিশেষ কিছু বলেননি। শুধু বলেছেন, “এক দা-এ অনেক কাজ হয়ে যাবে।” কিন্তু সেই সাধারণ মন্তব্যই এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ বলছেন, তিনি নিছকই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দা কিনেছেন। আবার কারও মতে, এটা রামনবমী মিছিলের আগে একধরনের বার্তা।
আরও পড়ুনঃ থানায় বিচার চাইতে গিয়ে উল্টে নিগৃহীত IIT প্রাক্তনী! পুলিশের বিরুদ্ধে উঠল চাঞ্চল্যকর অভিযোগ!
প্রশ্ন উঠছে, আগামী রামনবমীর মিছিলে কি দিলীপ ঘোষকে এই দা হাতে দেখা যাবে? রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, বিজেপির রামনবমী মিছিল বরাবরই চর্চার বিষয়। কিছু বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় এই মিছিল ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। আগেও বিজেপির বেশ কয়েকজন নেতাকে হাতে গদা, তরোয়াল নিয়ে মিছিলে হাঁটতে দেখা গিয়েছে। এবার সেই তালিকায় দা যুক্ত হবে কি না, তা নিয়েই রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা।
বিরোধীরা ইতিমধ্যেই কটাক্ষ করতে শুরু করেছে। তৃণমূলের এক নেতা মন্তব্য করেছেন, “রাজনীতিতে অস্ত্রের দরকার নেই। মানুষের ভালোবাসা থাকলে দা হাতে নিয়ে ঘুরতে হয় না।” যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে দিলীপ ঘোষের এই আচরণ যে কৌশলগত, তা অনেকেই মনে করছেন।
গোপীনাথ মেলা শুধুই সাধারণ মেলা নয়, এটি ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শ্রীচৈতন্যের পার্ষদ গোবিন্দ ঘোষ ভাগীরথীর তীরে গোপীনাথ দেবের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনশ্রুতি, তাঁর মৃত্যুর পর স্বয়ং গোপীনাথই তাঁর পারলৌকিক কাজ সম্পন্ন করেন। সেই থেকে প্রতিবছর চৈত্র একাদশীতে এই মেলা আয়োজিত হয়, যেখানে লক্ষাধিক মানুষ আসেন। এ বছর দিলীপ ঘোষের উপস্থিতি ও তাঁর ‘দা’ কেনার ঘটনা মেলাকে আরও বেশি চর্চার কেন্দ্র করে তুলেছে। এটা নিছকই ব্যক্তিগত পছন্দ, নাকি এর মধ্যে কোনও রাজনৈতিক কৌশল লুকিয়ে রয়েছে, তা ভবিষ্যতেই স্পষ্ট হবে। তবে এক বিষয় পরিষ্কার—দিলীপ ঘোষের এই ‘দা’ এখন রাজনৈতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে!






