ই ক’দিন ধরে সকাল গড়াতে না গড়াতেই সূর্যের তেজ যেন চাঁদনির শহরেও আগুন ছড়াচ্ছে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানোই যেন রীতিমতো সাহসিকতার কাজ। মাথার উপর ছাতা নেই, আশেপাশে গাছের ছায়াও মেলে না। হকারদের গলাতেও যেন আর সেদিনকার চিৎকার শোনা যায় না—ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মুখগুলি যেন নিঃশব্দেই বুঝিয়ে দেয় গরম কীভাবে দেহ ভেঙে দিচ্ছে।
প্ল্যাটফর্মে পা রাখতে না রাখতেই চোখে পড়ল এক অন্য ছবি। প্লাস্টিকের ছোট্ট টুলে বসে একজন বৃদ্ধ, সিঁড়ির পাশ ঘেঁষে। গলায় নেই কোনও ডাকে বিক্রির তাগিদ, সামনের বালতিতে রাখা কিছু পাঁপর আর পাশে লেখা সাদা কাগজে—”আমার কাছ থেকে কিছু কিনুন”। ওই গরমে সবার যখন ছায়ার খোঁজ, তখন তিনি ছায়া নয়, খুঁজছেন বেঁচে থাকার সামান্য সুযোগ।
এক বোতল ঠান্ডা জল হাতে নিয়ে কাছে গিয়ে বসতেই কথা জড়িয়ে এল। নাম বললেন ‘সুজিত’। বয়স প্রায় পঁচাত্তর পেরিয়ে গেছে। শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না। তবু সংসারের খরচ, নিজের ওষুধ, একবেলার খাবারের জন্য রোজ স্টেশনে বসে থাকেন। তাঁর নিজের মুখে বললেন—”ভিক্ষে চাই না, তাই যা পারি বিক্রি করি”। পাঁপরই তাঁর অস্ত্র, আত্মসম্মানের, লড়াইয়ের।
পাঁচ টাকায় বিক্রি করেন চালের পাঁপর। শুধু এই নয়, সময় সুযোগমতো আরও নানা ধরনের পাঁপর তৈরি করে নিয়ে আসেন। বড় পুঁজির ব্যবসা নয়, কিন্তু এই ছোট্ট উদ্যোগটাই তাঁর জীবনের বড় সহায়। স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে কখনও কারও মুখ চেনা হয়, কেউ এক প্যাকেট কিনে নিয়ে যায়, কেউ শুধু তাকিয়ে থাকে। তবে কেউ কেউ গল্প শোনে, এবং সেই গল্পই ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনে।
আরও পড়ুনঃ Road accident : সপ্তাহের শুরুতেই মৃত্যু যাত্রা! অফিস যেতে গিয়ে বাসের চাকায় পিষে প্রাণ গেল যুবকের!
আপনি যদি চন্দননগর স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ওঠেন, সিঁড়ির পাশে একবার তাকিয়ে দেখবেন তাঁকে। হয়তো আপনার পাঁপরের দরকার নেই, কিন্তু তাঁর তো দরকার একজন সহানুভূতিশীল ক্রেতার। যদি কোনওদিন তাঁর কাছ দিয়ে হাঁটেন, ভেবে দেখবেন, মাত্র পাঁচ টাকায় হয়তো একটা প্যাকেট পাঁপর কিনে আপনি একটা দিন বদলে দিতে পারেন। ছোটো ভালোবাসায় যেমন অনেক বড় গল্প গাঁথা থাকে, তেমনি এই বৃদ্ধের জীবনে হয়তো আপনার ক্ষুদ্র সহানুভূতিই হতে পারে সবচেয়ে বড় সহায়।





