বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এবার নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লোগো বা পরিচিতি চিহ্ন। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি উইকিপিডিয়া পাতায় আগের পরিচিত ‘বিশ্ববাংলা’ লোগোর বদলে অন্য একটি প্রতীক দেখা গিয়েছে। সেই নতুন প্রতীকে ব্যবহার করা হয়েছে জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনও লোগো পরিবর্তনের ঘোষণা করা হয়নি, তবুও এই বিষয় ঘিরে নানা জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ভাইরাল হওয়া ছবিটি সামনে আসার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, সত্যিই কি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লোগো বদলে যাচ্ছে? কারণ দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের সরকারি অনুষ্ঠান, প্রশাসনিক প্রচার এবং বিভিন্ন প্রকল্পে ‘বিশ্ববাংলা’ ব্র্যান্ডই ছিল অন্যতম প্রধান পরিচিতি। নীল-সাদা রঙের সেই লোগো ধীরে ধীরে রাজ্যের প্রশাসনিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। তৃণমূল কংগ্রেস বহুবার দাবি করেছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই এই লোগোর নকশা তৈরি করেছিলেন। সরকারি মেলা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্মেলন, পর্যটন প্রচার কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশ্ববাংলা ব্র্যান্ডকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত। ফলে আচমকা অন্য একটি প্রতীক দেখা যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
তবে এই ভাইরাল ছবিকে ঘিরে সন্দেহও প্রকাশ করেছেন অনেকেই। নেটিজেনদের একাংশের দাবি, উইকিপিডিয়ার তথ্য সাধারণ মানুষও সম্পাদনা করতে পারে। তাই কোনও ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওই লোগো পরিবর্তন করে থাকতে পারেন। আবার অনেকেই মনে করছেন, ছবিটি এআই জেনারেটেড বা এডিট করা হতে পারে। কারণ সরকারি কোনও ওয়েবসাইট, বিজ্ঞপ্তি বা প্রশাসনিক নথিতে এখনও পর্যন্ত নতুন লোগোর উল্লেখ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার আগে সরকার বা সরকারি সূত্রের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করাই উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন অনেকে।
আরও পড়ুন: “যে শিশু মায়ের ভালোবাসা পায়নি, তাকে দিয়েই মা হওয়ার স্বাদ পূর্ণ করেছি” নিজের সন্তান নেননি, কৌশিকের ১৩ বছরের ছেলেকেই আগলে মানুষ করেছেন লাবণী সরকার! মাতৃদিবসে সামনে এল, অভিনেত্রী জীবনের অজানা অধ্যায়!
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি লোগো বিতর্ক হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভাবধারার পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও এই ঘটনাকে দেখা হচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনসংঘ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাবকে সামনে আনতেই এই ধরনের প্রতীকী পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শুধু জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতাই নন, তিনি একসময় বাংলার শিক্ষাবিদ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে এসেছে যে বাংলার ইতিহাসে তাঁর অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সেই কারণেই অনেক বিজেপি সমর্থক এই ধরনের প্রতীককে “ঐতিহাসিক সংশোধন” হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন।
তবে বিরোধীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৃণমূল সমর্থকদের অভিযোগ, বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁদের দাবি, বিশ্ববাংলা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক প্রতীক ছিল না, বরং তা বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি, পর্যটন এবং ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক পরিচয় বহন করত। সেই জায়গায় কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রশাসনিক প্রতীকের অংশ করা হলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনও নিশ্চিত ঘোষণা সামনে আসেনি, তাই এই বিতর্কের আসল সত্য কী, তা জানতে অপেক্ষা করতেই হবে সাধারণ মানুষকে।






