বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর প্রায় ২০ দিন ধরে রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই নীরব ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। শুধুমাত্র একটি সাংবাদিক বৈঠক ছাড়া তাঁকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি। তবে শনিবার, ২৪ মে, হঠাৎই ফেসবুক লাইভে এসে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে সরব হলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ইভিএম, বিজেপির রাজনৈতিক আচরণ থেকে শুরু করে বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি একাধিক ইস্যুতে সরাসরি আক্রমণ শানালেন তিনি। দীর্ঘ নীরবতার পর তাঁর এই লাইভ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
ফেসবুক লাইভে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, এবারের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ২২০ থেকে ২৩০টি আসন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে “পাশা উল্টে দেওয়া হয়েছে” বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর কথায়, “মানুষ আমাদের পাশে ছিল। আমরা যেভাবে মানুষের সমর্থন পেয়েছি, তাতে আরও বেশি আসন পাওয়ার কথা ছিল।” তিনি আরও দাবি করেন, অন্তত ১৫০টি আসনে কারচুপি হয়েছে এবং বহু জায়গায় তাঁদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। যদিও তাঁর এই অভিযোগের পক্ষে কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবুও তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে।
নির্বাচন কমিশন ও ভোট প্রক্রিয়া নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল নেত্রী। তিনি বলেন, “এটা কি সত্যি নির্বাচন হয়েছে? নাকি একটা প্রহসন হয়েছে?” একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ডেটা হ্যাকিংয়ের অভিযোগও তোলেন তিনি। মমতার দাবি, তাঁদের কাছে এমন তথ্য রয়েছে যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ইভিএম প্রসঙ্গেও সরব হন তিনি। তাঁর বক্তব্য, “ইভিএমের মেশিনের রিপোর্ট চাই আমাদের।” ভোট গণনা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মানুষ ভোট দিলেও সেই রায় সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
এদিন বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি সরকার এমন পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে সাধারণ মানুষ ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তিনি বলেন, “কেউ ভাবছেন চাকরি থাকবে কি না, কেউ ভাবছেন ব্যবসা টিকবে কি না।” ভোট পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগও তোলেন তিনি। মমতার দাবি, তাঁদের দু’ থেকে আড়াই হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, বহু পার্টি অফিস ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন স্টেশন থেকে হকারদের উচ্ছেদ করে তাঁদের জীবিকা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, “আইন সবার জন্য এক। সত্যি জিতলে এভাবে অত্যাচার করতেন না।”
ধর্মীয় বিষয় নিয়েও লাইভে সরব হন তৃণমূল সুপ্রিমো। রাজ্য সরকারের মাইক ব্যবহারের নতুন নির্দেশিকা এবং ঈদের নামাজ ব্রিগেডে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। মমতা বলেন, “আপনারা আজান চান না। শব্দের মাত্রা বেঁধে দিন, কিন্তু সবার জন্য একই নিয়ম করুন। কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।” একই সঙ্গে পুরোহিত ও ইমাম ভাতা বন্ধ করা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই ভাতা সম্মান জানানোর জন্য দেওয়া হত এবং তা কোনও বিশেষ সুবিধা নয়। এছাড়াও যুবভারতীতে মূর্তি ভাঙার ঘটনায়ও ক্ষোভ উগরে দেন মমতা। তিনি বলেন, “ছোট ছোট শিশুরা সেখানে সেলফি তুলত। ফিফাও সেটাকে প্রশংসা করেছিল। নিজেদের মূর্তি বসানোর জন্য সেটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”
আরও পড়ুন: রাজকীয় সাজে সিংহাসনে বসে দেব, নতুন চমকে বাড়ল জল্পনা! ‘দাদাগিরি’র প্রথম ঝলক নাকি নতুন ছবির লুক? নেটপাড়ায় উত্তেজনা বাড়তেই জানা গেল আসল কারণ?
ফেসবুক লাইভের শেষদিকে আরও একবার বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “উপরওয়ালা সব দেখছে। বাংলাকে লুঠ করা হয়েছে। কিন্তু এই অন্যায়ের জবাব মানুষ দেবে। আপনার দিল্লিও একদিন চলে যাবে।” একই সঙ্গে তিনি জানিয়ে দেন, এখন থেকে তাঁর প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হবে ফেসবুক লাইভ। সংবাদমাধ্যমের সামনে আর খুব একটা কথা বলবেন না বলেও স্পষ্ট জানান তিনি। তাঁর কথায়, “আমার অস্ত্র আমার ফেসবুক। আগামিদিনে কিছু বলার থাকলে ফেসবুক লাইভেই বলব।” দীর্ঘ নীরবতার পর মমতার এই বিস্ফোরক লাইভ রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।






