ভরাডুবির পর সাংগঠনিক রদবদল, অভিষেকের উপরেই ভরসা রাখলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়! নতুন দলে কার হাতে কোন দায়িত্ব?

রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ এবং নির্বাচনী বিপর্যয়ের আবহে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসে বড়সড় সাংগঠনিক রদবদল করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দলীয় কাঠামো কার্যত নড়বড়ে হয়ে পড়ার পর নতুন করে সংগঠন সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল, সমস্ত বিতর্ক এবং সমালোচনার মাঝেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদেই বহাল রাখা। একই সঙ্গে রাজ্য থেকে জাতীয় স্তর পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ ও নতুন দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠনের বার্তা দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনী ধাক্কার পর তৃণমূলের অন্দরে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। একাংশ বিধায়ক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, এমনকি বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে পৃথক অবস্থানও দেখা গিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকদিন আগে দলের বিভিন্ন ফ্রন্টাল সংগঠনের সমস্ত পদ কার্যত বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ছাত্র, যুব, মহিলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শাখা সংগঠনের পুরনো কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুনভাবে সংগঠন গড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের পরেই সামনে এল পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক তালিকা। জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে সর্বভারতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন দোলা সেন এবং ডেরেক ও’ব্রায়েন। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, আগামী দিনে সংগঠনের বিস্তৃত কাজ সামলাতে এই অতিরিক্ত নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল।

আরও পড়ুন: ‘দাদাগিরি ছাড়া আর কী করেছে? সেদিন তো শ্রীলেখার সঙ্গে…’ তো’লাবাজি, শ্লী’লতাহা’নির অভিযোগে গ্রেফতার স্বরূপ বিশ্বাস, কোন স্মৃতি উস্কে বি*স্ফোরক ভাস্বর চ্যাটার্জি?

রাজ্য স্তরেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে। মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন মালা রায়। যুব তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে রাখা হয়েছে সায়নী ঘোষকে, অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ পদে আনা হয়েছে প্রিয়াঙ্কা চৌধুরীকে। শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন মলয় ঘটক। এই পদে আগে ছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দল থেকে তাঁর বহিষ্কারের পরও ওই পদে তাঁর নাম থাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল দলের একাংশের মধ্যে। নতুন ঘোষণার মাধ্যমে সেই বিতর্কেরও অবসান ঘটানোর চেষ্টা হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। পাশাপাশি রাজ্য মুখপাত্র হিসেবে কুণাল ঘোষকে এবং জাতীয় মুখপাত্র হিসেবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও’ব্রায়েনকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা সংক্রান্ত ট্রেড ইউনিয়ন ও হকার সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মদন মিত্রকে।

তবে এই সাংগঠনিক রদবদলের সবচেয়ে আলোচিত দিক নিঃসন্দেহে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরেই। নির্বাচনী ব্যর্থতার পর দলের একাংশের ক্ষোভের কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন তিনি। বিদ্রোহী বিধায়কদের অভিযোগ ছিল, নেতৃত্বের কিছু সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই দল জনসমর্থন হারিয়েছে। অনেকেই প্রকাশ্যে অভিষেকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জল্পনা তৈরি হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই পথে হাঁটলেন না। বরং দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁকে বহাল রেখে স্পষ্ট বার্তা দিলেন যে নেতৃত্বের প্রশ্নে তিনি এখনও অভিষেকের উপর আস্থা রাখছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল সাংগঠনিক নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের ভিতরে নিজের কর্তৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে আরও একবার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। নির্বাচনী ফল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তিনি বারবার দাবি করেছেন যে দল প্রকৃত অর্থে পরাজিত হয়নি, বরং নানা কারণে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই অবস্থান থেকেই সম্ভবত তিনি নেতৃত্বের প্রশ্নে বড় কোনও আপস করতে চাননি। একই সঙ্গে অভিষেকের পাশে দোলা সেন এবং ডেরেক ও’ব্রায়েনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাও স্পষ্ট। কুণাল ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের কাজের পরিধি অনেক বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে সহযোগিতা করার জন্যই নতুন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ করা হয়েছে। এখন দেখার, এই নতুন সাংগঠনিক কাঠামো দলের ভাঙন রুখে আগামী দিনে তৃণমূলকে কতটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারে।

আরও অন্যান্য খবর