বাংলার মানুষের কাছে ফুটবল শুধুই একটি খেলা নয়, এটি আবেগ, পরিচয় এবং গ্যালারিতে বসে হাজারো সমর্থকের সঙ্গে আনন্দ-হতাশা ভাগ করে নেওয়ার এক অনন্য অনুভূতি। কলকাতা ডার্বি মানেই সেই আবেগের চূড়ান্ত প্রকাশ। বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখেছি ক্রীড়ামন্ত্রীদের মাঠে নেমে খেলোয়াড়দের শুভেচ্ছা জানাতে, তারপর ভিআইপি বক্সে বসে ম্যাচ উপভোগ করতে। কিন্তু এবার সেই চিরাচরিত ছবিটাই বদলে গেল। প্রথমবার কোনও ক্রীড়ামন্ত্রীকে দেখা গেল ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচে সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতে। অনেকের মতে, বাংলার ক্রীড়া প্রশাসনে এই দৃশ্য একটি নতুন বার্তা দিল মন্ত্রীও একজন দর্শক, তিনি ভিআইপি নন।
গতকাল অর্থাৎ ২৫ জুলাই ডুরান্ড কাপের ১৩৫তম সংস্করণের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ভারতীয় ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এবং ইস্টবেঙ্গল এফসি। বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অনুষ্ঠিত মরশুমের প্রথম কলকাতা ডার্বিতে ১-০ গোলে জয় তুলে নেয় মোহনবাগান। ম্যাচের ৫২তম মিনিটে সহল আব্দুল সামাদের একমাত্র গোলে সবুজ-মেরুন শিবির জয় পায়। ইস্টবেঙ্গল একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও গোলরক্ষক বিশাল কাইথের দুরন্ত সেভে সমতা ফেরানো সম্ভব হয়নি। মাঠে ছিল হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমীর উন্মাদনা, আর সেই উন্মাদনার অংশ হয়ে ওঠেন রাজ্যের নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী ডঃ ইন্দ্রনীল খাঁ।
ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম তিনি কলকাতা ডার্বি দেখতে যুবভারতীতে যান। তবে তিনি ভিআইপি বক্সে বসেননি। সরাসরি ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে গিয়ে সাধারণ সমর্থকদের সঙ্গে বসে পুরো ম্যাচ উপভোগ করেন। ম্যাচের আগে স্টেডিয়ামের প্রস্তুতিও খতিয়ে দেখেন তিনি। দর্শকদের সুবিধার জন্য প্রথমবার সিনেমা হলের মতো ই-টিকিট ও কিউআর কোড স্ক্যান করে মাঠে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্যালারিতে পর্যাপ্ত পানীয় জল রয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও তিনি নিজে খোঁজ নেন। কাগজের গ্লাসে পরিষ্কার পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দর্শকদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। খেলা শেষে তিনি জানান, দর্শকদের জন্য এই ব্যবস্থা করতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁর এই আচরণ অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, এই আবহে অতীতের তৃণমূল আমলে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ফের আলোচনার কেন্দ্রে। লিওনেল মেসির কলকাতা সফরের সময় হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও বহু দর্শক মেসির দেখা পাননি। আরোও অভিযোগ ছিল, মন্ত্রী ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের ভিড়েই সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছিলেন। ভিআইপি সংস্কৃতির কারণে স্টেডিয়ামে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল এবং ক্ষুব্ধ দর্শকরা ভাঙচুরও চালান। পরবর্তীতে সেই ঘটনার তদন্ত শুরু হয় এবং অরূপ বিশ্বাস ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকেও সরে দাঁড়ান। একদিকে যেখানে সাধারণ দর্শকদের মাঠের নায়ককে দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, অন্যদিকে এবার নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী নিজেই দর্শকদের মধ্যে গিয়ে বসে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বার্তা দিলেন।
আরও পড়ুনঃ তৃতীয়বার বাবা হলেন কাঞ্চন মল্লিক! কন্যা কৃষভির পর, শ্রীময়ীর কোলজুড়ে এলো ফের সন্তান! প্রকাশ্যে এল নামও? ছেলে হলো না মেয়ে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই লিখছেন, বাংলার ক্রীড়া প্রশাসনে সত্যিই পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। তাঁদের বক্তব্য, একজন ক্রীড়ামন্ত্রীর কাজ শুধু মাঠে উপস্থিত থাকা নয়, দর্শকদের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া। ভিআইপি বক্সের আড়ম্বর ছেড়ে সাধারণ মানুষের পাশে বসে খেলা দেখা, গ্যালারির পানীয় জলের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা এবং প্রযুক্তিনির্ভর টিকিট ব্যবস্থার সূচনা এই পদক্ষেপগুলি অনেকের কাছেই ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকেই বলছেন, বাংলার রাজনীতিতে যেমন পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, তেমনই ক্রীড়াক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ডঃ ইন্দ্রনীল খাঁর এই উদ্যোগ অন্তত এটুকু বুঝিয়ে দিয়েছে ফুটবলের আসল জায়গা গ্যালারিতেই, আর সেই গ্যালারির মানুষদের সম্মান জানানোই একজন ক্রীড়ামন্ত্রীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।






