সুশান্তের মত পরিণতি আপনার হবে না তো? জেনে নিন মানসিক অবসাদ নিয়ে বিশদ তথ্য

গতকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা নিয়ে। যত না তার মৃত্যু মানুষকে তাড়া করছে তার থেকে বেশি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাঁর মৃত্যুর কারণটা। জানা গিয়েছে প্রবল মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন সুশান্ত। নিজের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি বেছে নেন আত্মহত্যার মতো চরম পথ।

সুশান্ত-র মতো আমরা অনেকেই আছি। সুশান্ত তবু নিজের চিকিৎসা শুরু করাতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমরা অনেকেই বুঝতেই পারিনা যে আমরা অবসাদগ্রস্ত কিংবা আমরা যদি বুঝতেও পারি আমাদের আশেপাশের লোক গুলো সেটা বুঝতেই চায় না, “ও পাগলের প্রলাপ” বলে তারা এক লহমায় উড়িয়ে দেয়। আর তার পরেই ঘটে বিপত্তি। যন্ত্রণা নিজের ভিতর চেপে রাখতে রাখতে একসময় এই অবসাদগ্রস্ত মানুষগুলোই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার মত পথটা সহজেই বেছে নেয়।

সুশান্তের মত অত বড় তারকার এই করুণ পরিণতি কোথাও গিয়ে মানসিক সমস্যাও যে বড় সমস্যা, এমনকি কিছু কিছু সময় তা শারীরিক সমস্যার থেকেও বড় আকার ধারণ করে সেটাই যেন একবার ফের বুঝিয়ে দিল। মেন্টাল হেলথ নিয়ে কিছুটা হলেও কথাবার্তা কাল থেকে শুরু হলো সোশ্যাল মিডিয়ায়। এই অবস্থায় আপনার ঠিক কী করণীয়? আপনি নিজে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন কিনা কিংবা আপনার পরিচিত কেউ ভুগছে কিনা সেটা একবার ভেবে দেখার সময় এসেছে।

মানসিক অবসাদ মানে মন খারাপ নয়। এটা আরো অনেক বড় শব্দ। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদগ্রস্ত থাকলে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার প্রবণতা জন্ম নেয় মানুষের মধ্যে। আবার সব মানসিক অবসাদগ্রস্ত মানুষই আত্মহত্যার কথা ভাবেন না।

এ বিষয়ে কী বলছেন মনোবিদরা?

মনোবিদরা বলছেন, জীবনে যেকোনও ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া, ব্যক্তিগত বা আর্থিক ক্ষেত্রে কোনও বিপর্যয়, সমাজ বা বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, সঙ্গীর মৃত্যু বা বিচ্ছেদ-এমন নানা হতাশা থেকেই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার প্রবণতা জাগতে পারে যে কোনও কারও মধ্যেই৷ করোনা অতিমারির জেরে সেই প্রবণতা আরও বেড়েছে৷

মনোবিদদের মতে অবসাদটাই বা কী?

তাঁদের মতে একদিন মন খারাপ মানে আপনি অবসাদে ভুগছিলেন সেটা কোনদিনও নয়। এটা তার থেকে অনেক জটিল৷ ক্রমাগত মনের মধ্যে জমাট বাঁধতে থাকা হতাশা, দুঃখ, দৈনন্দিন জীবনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, যা বেঁচে থাকাটাই কঠিন করে তোলে৷ অবসাদগ্রস্তদের মধ্যে অধিকাংশ সময় আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে৷
dsm-5 বলে একটি পদ্ধতি রয়েছে যেখান থেকে আপনার চেনা কেউ মানসিক অবসাদগ্রস্ত কিনা সেটা নির্ণয় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা যায়। সেখানে নটি প্রশ্ন করা হয় এবং তার ভিত্তিতে পয়েন্ট দেওয়া হয়। মোট ২৭ পয়েন্ট এর প্রশ্ন করা হয়। সাধারণত আপনি যদি কুড়ি’র উপরে পয়েন্ট পান তবে বুঝবেন আপনার চিকিৎসক দেখাবার সময় হয়ে এসেছে।

জীবন থেকে ইতিবাচক চিন্তা সকল হারিয়ে যেতে শুরু করছে ধারাবাহিকভাবে এবং শুধুমাত্র হতাশা নেতিবাচক চিন্তা সারাক্ষণ ঘিরে ধরেছে আপনার মধ্যে তখন বুঝবেন আপনি মানসিক অবসাদের ফাঁদে ঢুকে পড়েছেন। আপনার আশেপাশে কিছু খারাপ হলেই আপনার মনে হবে এর জন্য আপনি দায়ী। জীবনের সমস্ত শখ-আহ্লাদ হঠাৎ করে জীবন থেকে চলে যাবে মানে আপনি সেগুলোতে আর কোনভাবেই অংশগ্রহণ করতে চাইবেন না।

সারাক্ষণ আপনার মধ্যে কাজ করবে ক্লান্তি। হয় আপনি বেশি ঘুমাবেন নয়তো আপনি ঘুমাবেন ই না। আপনার হয় খুব খিদে পাবে নয়তো আপনার খাবারের রুচি চলে যাবে। আপনার ওজন হঠাৎ করে বেড়ে যাবে নতুবা হঠাৎ করে কমে যাবে। আপনি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কথায় কথায় ইমোশনাল আউটবার্স্ট হবে। আপনি হয়তো প্রথম ১০ মিনিটে খুব খুশি থাকবেন পরবর্তী ১০ মিনিটেই জীবনের সমস্ত দুঃখ গুলো আপনাকে ঘিরে ধরবে। আর এর থেকে আপনি চাইলেও নিজে নিজে বের হতে পারবেন না।

এই প্রবণতা গুলি যদি আপনি নিজের মধ্যে নিজের বন্ধুবান্ধব পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে দেখে থাকেন তাহলে সতর্ক হোন। এই ধরনের মানুষকে কখনো একা রাখবেন না, নিজে যদি এরকম অনুভব করেন তবে নিজে একা থাকবেন না পরিবারের যে কোন সদস্যের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করবেন সবসময়।

আপনি নিজে ধৈর্য ধরে তাদের কথা শুনুন, বিরক্ত হবেন না। কারণ মনে রাখবেন তাদের এই পরিস্থিতি কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তারা এই পরিস্থিতি থেকে বেরোবার জন্য আপ্রাণ লড়াই করে যাচ্ছে। আর চিকিৎসকের সাহায্য অবশ্যই নিন। নিজে পাশে থাকুন, কিন্তু কী করতে হবে না হবে এই পরামর্শ শুধুমাত্র প্রফেশনাল মানুষই দিতে পারবেন।

আপনার মনে জীবন শেষ করে দেওয়ার চিন্তা আসবে যদি আপনি মানসিক অবসাদগ্রস্ত হন। যখনই এরকম চিন্তা আসবে কিন্তু আপনি চাইবেন না করতে তার মানে আপনি বুঝতে পারছেন যে আপনার সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে। সত্ত্বর কোন মনোবিদ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।

কোনও সময় জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাববেন না৷ মনে রাখবেন, আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতেই হবে৷ আত্মহত্যার কথা মাথায় এলে পরিবার, বন্ধুদের তা জানান৷ মনে রাখবেন আপনার জীবনের মূল্য আছে। পৃথিবীতে একজনের কাছে হলেও আপনার জীবনের মূল্য রয়েছে।

RELATED Articles

Leave a Comment