বাস্তবের ‘অযান্ত্রিক’! অটো-টোটোর দাপটে বন্ধ হয়েছে বাকি বাস, নস্টালজিয়াকে আঁকড়ে এখনও একটা বাসই চালিয়ে যাচ্ছেন ৩ নম্বর রুটের বাসের মালিক

লেখক সুবোধ সরকারের ছোটো গল্প ‘অযান্ত্রিক’-এর কথা মনে পড়ে? সেই গল্পের মুখ্য চরিত্র বিমলের সঙ্গে কীভাবে একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তাঁর ভাঙাচোরা ট্যাক্সির? ট্যাক্সি ভেঙেচুরে গেলেও শত অভাব সত্ত্বেও নিজের সেই প্রিয় বাহনটিকে হাতছাড়া করতে মোটেই রাজি হয়নি সে। এমন উদাহরণের দেখা মিলল বাস্তব জীবনেও। শ্রীরামপুরের সুদীপ গোস্বামীও অনেক কষ্টে নিজের প্রিয় বাহনটিকে আগলে রেখেছেন।

৩ নম্বর বাস! শহর কলকাতা থেকে শহরতলি, একসময় রীতিমতো দাপিয়ে বেড়াত এই বাস। উত্তর কলকাতার বাগবাজার থেকে শুরু করে শ্রীরামপুর, এই ছিল সেই বাসের রুট। কত কত অফিস যাত্রী থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ পড়ুয়াদের একমাত্র আশা-ভরসার জায়গা ছিল এই ৩ নম্বর রুটের বাস। কলকাতা থেকে হুগলি যাওয়ার এই বাসের উপর নির্ভর করতেন অনেকেই।

একসময় প্রায় ৭০-৭৫টি বাস চলত এই ৩ নম্বর রুটে। কিন্তু কালক্রমে কমতে থাকে সেই সংখ্যা। আর অটো আর টোটোর দাপটে বন্ধই হয়ে যায় সেই বাসের রুট। কিন্তু ওই যে বলে, শেষ হয়েও শেষ হয় না অনেক কিছুর। এই রুটে এখন একটাই ৩ নম্বর বাস চলে আর তা চালান খোদ বাস মালিকই।

হ্যাঁ, তিনিই হলেন সুদীপ গোস্বামী। একটি ৩ নম্বর বাসের মালিক তিনি। কিন্তু ৩ নম্বর বাসের রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধুমাত্র রুটটাকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে এখন নিজের বাসেই কন্ডাকটরি করেন তিনি। নিজের প্রিয় বাহনটিকে ত্যাগ করতে পারেন নি যে। সেই নস্টালজিয়া থেকেই এখনও এই একটি ৩ নম্বরের বাস নিয়ে রোজ বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়।

না, তবে যাত্রীর অভাবে এখন আর বাগবাজার থেকে শ্রীরামপুর নয়, এখন এই বাস চলে দক্ষিণেশ্বর থেকে শ্রীরামপুর পর্যন্ত। সুদীপবাবু জানান, এই ৩ নম্বর রুটের বাসের প্রায় ১০০ বছর পূর্তি হতে চলেছে। ১৯২৮ সালে প্রথম শুরু হয় এই বাস। সেই নস্টালজিয়াকে সঙ্গী করেই তাই বন্ধ করে দিতে পারেন নি তিনি বাসটি। একাই একটা বাস নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন রুটে।

সুদীপবাবু জানান যে এই বাস থেকে যে খুব একটা লাভ তাঁর হয় এমন নয়। কোনও কোনও দিন তো আবার ঘরের টাকা থেকেই পেট্রোল কিনতে হয় বা বাস মেরামতির কাজ করতে হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন এখন আঁকড়ে রয়েছেন এই বাস তিনি? তাঁর কথায়, শুধুমাত্র রুটটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য এখনও একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কোনওমতেই ছেড়ে দিতে পারেন না নিজের প্রিয় এই বাসকে। খুব শখ করে কিনেছিলেন যে।

তাই নিজে বাসের মালিক হয়েও কনডাক্টরি করছেন সুদীপবাবু। তাঁর কথায়, তিনি যতদিন সক্ষম থাকবেন, যতদিন এই বাস চালানোর মতো অবস্থায় থাকবে, সেই দিন পর্যন্ত তিনি এই বাস ওই রুটে চালিয়ে যাবেন।  

RELATED Articles