‘সারাদিন তো বাড়িতেই বসে থাকো, কী আর কাজ করো’, এমন কথা কমবেশি সব গৃহবধূদেরই শুনতে হয়। সত্যিই কী গৃহবধূদের শ্রমের কোনও পারিশ্রমিক হয় না? আইন কিন্তু অন্য কথা বলছে। সম্প্রতি এক মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, কোনও মহিলা চাকরি বা ব্যবসা না করলেও, তিনি যতটা সময় বাড়ির কাজের জন্য ব্যয় করেন, তার জন্য তাঁর সেই পারিশ্রমিক যোগ্য। এর আগে সর্বোচ্চ আদালত ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছিল যে কোনও মহিলা বাড়িতে থাকেন বলেই তিনি বেকার নন। তাঁর বাড়ির কাজের জন্য প্রতিদিন ১০০ টাকা করে ধার্য করতে হবে।
কোন মামলার কথা হচ্ছে?
২০০৬ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় বর্ধমানের বাসিন্দা লুফতা বেগমের। তাঁর ছেলে ক্ষতিপূরণের দাবী নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তিনি দাবী করেছিলেন যে মোটর এক্সিডেন্ট ক্লেম ট্রাইব্যুনাল থেকে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না তারা। নিম্ন আদালত রায় দিয়েছিল যে মৃতার ছেলেকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে অভিযোগ করে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন লুফতা বেগমের ছেলে। আজ, বৃহস্পতিবার বিচারপতি অজয় গুপ্তর ডিভিশন বেঞ্চে সেই মামলার শুনানি ছিল। এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি অজয় কুমার গুপ্তার একক বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, ওই মহিলার ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রাপ্য টাকা অবিলম্বে দিতে হবে মৃতার ছেলেকে। ওই বিমা সংস্থাকে ৪ লক্ষ ৫১ হাজার ৭০০ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দীয় হাইকোর্ট।
এদিন এই মামলার শুনানিতে উঠে আসে গৃহবধূদের উপার্জন প্রসঙ্গ। বিমা সংস্থার তরফে সওয়াল করার সময় তাদের আইনজীবী বলেন যে, মৃতা গৃহবধূ ছিলেন। তাঁর কোনও উপার্জন ছিল না। তাই এত টাকা ক্ষতিপূরণ দাবী করা হচ্ছে কেন?
এরপরই বিচারপতি সংশ্লিষ্ট সংস্থার আইনজীবীর উদ্দেশ্যে বলেন, “কোনও গৃহিণী মহিলার আয়কে আর পাঁচজন উপার্জনকারীর সঙ্গে তুলনা করা চলে না। কারণ তিনি শুধু উপার্জনই করেন না, গোটা সংসার এবং পরিবারকে আগলে রাখেন”। তাই তাঁর থেকে আয়ের নথি বা তথ্য জানতে চাওয়া অপ্রত্যাশিত বলেই মত আদালতের।
এই প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় নিজের রায়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তারভ কথায়, “যে শ্রম দিয়ে থাকেন তাঁর মূল্য তাঁরা পাননা। এর বিরুদ্ধে মত পোষন করে আমি রায় দিয়েছিলাম। সুপ্রিম কোর্টও এখন সেই দিকেই ঝুঁকেছে। কিন্তু আমি বলব এই নিয়ে আইন করা উচিত। কারণ এই সকল মহিলারা পরিচারিকারদের থেকেও বেশি কাজ করেন। কারণ পরিচারিকারা অর্থের বিনিময়ে কিছুক্ষণ কাজের পর চলে যান। অথচ গৃহবধূরা সারাক্ষণ সংসার সামলান। তাঁদের এই কাজের যথার্থ মূল্য দেওয়া উচিৎ। আর তাঁদের এই কাজের যথার্থ মূল্য দিলে অর্থনৈতিক সুরক্ষাও তৈরি হয়। সামাজিক সাম্য তৈরি হয়”।





