পরিচালক অনীক দত্তের মৃত্যুর খবর প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি অভিনেত্রী চৈতি ঘোষাল। দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষকে এভাবে হারিয়ে তিনি গভীরভাবে আঘাত পেয়েছেন। যদিও কখনও অনীকের ছবিতে কাজ করার সুযোগ হয়নি তাঁর, তবু তাঁদের বন্ধুত্বে কোনও দূরত্ব ছিল না। চৈতির কথায়, অনীক এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি নিজের মতাদর্শ নিয়ে কখনও আপস করতেন না। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতেন। সেই কারণেই অভিনেত্রীর কাছে অনীক দত্ত ছিলেন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের মানুষ। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে এমন স্পষ্টভাষী এবং সাহসী মানুষ খুব কম দেখা যায়। তাই এই মৃত্যু এখনও মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
অভিনেত্রী বার বার ফিরে গিয়েছেন কয়েক বছর আগের কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের স্মৃতিতে। সেই সময় উৎসবে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ও পোস্টার দেখে প্রকাশ্যে বিরক্তি জানিয়েছিলেন অনীক দত্ত। শুধু তাই নয়, বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনাও করেছিলেন পরিচালক। চৈতির মতে, ওই ঘটনার পর অনেকেই অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। কিন্তু অনীক কখনও কাউকে ভয় পেতেন না। তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান এবং বামপন্থী আদর্শ নিয়ে সবসময় সরব ছিলেন। অভিনেত্রী বলেন, ‘‘উনি যেটা বিশ্বাস করতেন সেটা নির্দ্বিধায় বলতে পারতেন।’’ এই স্পষ্ট অবস্থানই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল বলে মনে করেন চৈতি।
চৈতি আরও জানান, গত কয়েক বছর ধরে অনীকের শরীর খুব একটা ভাল যাচ্ছিল না। তবুও তাঁর প্রাণশক্তি বা কথা বলার আগ্রহে কোনও ঘাটতি ছিল না। অভিনেত্রীর কথায়, পাঁচ মিনিট কথা বলার জন্য ফোন করলে কখন যে এক ঘণ্টা কেটে যেত বোঝাই যেত না। গল্প করতে খুব ভালবাসতেন পরিচালক। মাঝে মাঝে মজা করে রাগও দেখাতেন তিনি। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শ এক হলেও তাঁদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হত না। বরং সিনেমা, সমাজ এবং নানা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েই বেশি কথা হত। চৈতির মতে, অনীক দত্ত ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি নিজের সামাজিক অবস্থান নিয়েও সবসময় খোলাখুলি কথা বলেছেন।
অনীকের কাজের প্রসঙ্গ উঠতেই বার বার ফিরে এসেছে তাঁর জনপ্রিয় ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর নাম। চৈতি মনে করেন, এই ধরনের ছবি বাংলা সিনেমায় আগে হয়নি, ভবিষ্যতেও খুব সহজে হবে না। তাঁর মতে, অনীকের ছবির মধ্যে যেমন ব্যঙ্গ ছিল, তেমনই ছিল সমাজ নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য। পরিচালক হিসেবে তিনি আলাদা ধরণের চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করতেন। অভিনেত্রীর কথায়, অনীক দত্তের মতো মানুষ সবসময় নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকতেন। কিন্তু এমন মানুষদের অনেক সময় সমাজ ঠিকভাবে মূল্য দেয় না। তাঁদের অনেক বাধা এবং মানসিক চাপের মধ্য দিয়েও যেতে হয় বলে মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ ‘আমি বয়সে বড়, কিন্তু ইমেজে অনীক আমার থেকে অনেক অনেক বড়’! পরিচালকের মৃ’ত্যুর খবর পেয়ে, শুটিং ফ্লোরেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন দুলাল লাহিড়ী! স্মৃতির বাক্স খুলে, কোন কোন অভিজ্ঞতা সামনে আনলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা?
অনীকের মৃত্যু নিয়ে এখনও ধন্দে রয়েছেন চৈতি ঘোষাল। তাঁর কথায়, এত দৃঢ়চেতা এবং শিরদাঁড়া শক্ত একজন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারেন, এটা তিনি কোনওভাবেই মানতে পারছেন না। অভিনেত্রীর মতে, অনীক ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং সাহসী মানুষ। তাই তাঁর চলে যাওয়ার খবর এখনও অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। চৈতি বলেন, এমন মানুষ সমাজে খুব কম জন্মান, যাঁরা নিজের বিশ্বাসকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন। পরিচালকের মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের বড় ক্ষতি হয়েছে বলেও মত তাঁর। অনীক দত্তের স্মৃতি, কাজ এবং স্পষ্ট অবস্থান আগামী দিনেও বহু মানুষের মনে থেকে যাবে বলেই মনে করছেন অভিনেত্রী।






