পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের ফলাফল ঘিরে ফের একবার রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। একদিকে সমাজমাধ্যমে সক্রিয়তা, অন্যদিকে মাঠের ভোট রাজনীতিতে দুর্বল সংগঠন, এই দুই বিপরীত ছবির মাঝেই বামেদের তারকা প্রার্থীদের পারফরম্যান্স আরও একবার প্রশ্নের মুখে। বহু আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী দিয়েও উল্লেখযোগ্য সাফল্য না পাওয়ায় কার্যত “ফেসবুক বিপ্লবী” তকমা নিয়েই ভোট ময়দান ছাড়তে হয়েছে তাঁদের। তবে এর মাঝেই মুর্শিদাবাদের ডোমকল কেন্দ্র কিছুটা হলেও মুখরক্ষা করেছে বাম শিবিরের।
এই নির্বাচনে বামফ্রন্ট মোট ১৯৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, যা ২০১৬ ও ২০২১ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শরিক দলগুলিকে ধরলে সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫২টি আসনে। তবুও অধিকাংশ কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে বামেরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংগঠনগত দুর্বলতা, তরুণ ভোটারদের থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং প্রভাবশালী প্রতিপক্ষের সামনে কৌশলগত ব্যর্থতাই এই ফলাফলের অন্যতম কারণ।
তারকা প্রার্থীদের তালিকায় অন্যতম পরিচিত নাম মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। নন্দীগ্রাম থেকে শুরু করে উত্তরপাড়া, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে লড়াই করলেও বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন তিনি। ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম ভোটে মাত্র ৬,২৬৭ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন মিনাক্ষী। এ বার উত্তরপাড়াতেও তাঁর ফলাফল একইরকম হতাশাজনক। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির এই সদস্যকে ঘিরে সংগঠনের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি বলেই মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
আরেক তারকা প্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, যিনি একসময় কলকাতার মেয়র ছিলেন, যাদবপুর কেন্দ্র থেকেও হেরে গেছেন। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে তিনি ভালো ভোট পেলেও বিধানসভা নির্বাচনে সেই সাফল্য ধরে রাখতে পারেননি। একইভাবে দমদম উত্তরে দীপ্সিতা ধর, পানিহাটিতে কলতান দাশগুপ্ত এবং কামারহাটিতে মানস মুখোপাধ্যায়, সবাই নিজেদের কেন্দ্রে তৃতীয় স্থানে নেমে গিয়েছেন। বিশেষ করে কলতান দাশগুপ্তের ক্ষেত্রে আরজি কর আন্দোলনের মুখ হিসেবে জনপ্রিয়তা থাকলেও তা ভোটে রূপান্তরিত হয়নি।
অন্যদিকে রাজারহাট নিউটাউন কেন্দ্রে গৌতম দেবের পুত্র সপ্তর্ষি দেব এবং বালিগঞ্জে আফরিন বেগমও ব্যর্থ হয়েছেন উল্লেখযোগ্য সাফল্য আনতে। সপ্তর্ষি দেব ২০২১ সালের মতো এবারও তৃতীয় স্থানে থাকেন, আর আফরিন বেগম প্রথমবার ভোটে লড়েই বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েন। রানিবাঁধে প্রাক্তন মন্ত্রী দেবলীনা হেমব্রমও পরাজিত হন, যদিও তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং পূর্বের জয়ের ইতিহাস ছিল। ফলে বাম শিবিরের তারকা নির্ভর কৌশল কার্যত প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে এই হতাশার মাঝেও কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে মুর্শিদাবাদের ডোমকল কেন্দ্র। সেখানে বাম প্রার্থী মহম্মদ মুস্তাফিজ়ুর রহমান এগিয়ে রয়েছেন, যা দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বিধানসভায় বামদের সম্ভাব্য উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত বিধানসভা পর্যন্ত রাজ্য বিধানসভায় বামদের আসন সংখ্যা শূন্য ছিল, ফলে এই একটি আসনও তাদের জন্য প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে একক সাফল্য গোটা রাজনৈতিক পুনরুত্থানের জন্য যথেষ্ট নয় বলেই মত পর্যবেক্ষকদের।
আরও পড়ুন: তৃণমূলের হার নিশ্চিত হতেই গণনা কেন্দ্র ছাড়লেন রাজ চক্রবর্তী! পরাজিত সাংসদের গায়ে ছোড়া হল কাদা, উঠল ‘চোর চোর’ স্লোগান!
সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে বামফ্রন্টের চিত্র স্পষ্ট একদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়তা ও আন্দোলনের ভাষা, অন্যদিকে ভোট বাক্সে দুর্বল উপস্থিতি। তারকা প্রার্থীদের বড় অংশই তৃতীয় স্থানে শেষ করেছেন, যা সংগঠনের ভিতরের সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। যদিও কিছু কেন্দ্রে লড়াইয়ের উপস্থিতি বজায় ছিল, কিন্তু সেটি ভোটে পরিণত করতে না পারাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভবিষ্যতে সংগঠন পুনর্গঠন না করলে এই প্রবণতা বদলানো কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে।





