দেশজুড়ে ভোটগণনা চলাকালীন এক উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই ফের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে তৃণমূল কংগ্রেস। গণনার প্রাথমিক প্রবণতায় যখন বিজেপি এগিয়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত মিলছে, ঠিক সেই সময়ে দলীয় প্রার্থী ও কাউন্টিং এজেন্টদের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যে যেমন আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়েছে, তেমনই একাধিক অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিতও উঠে এসেছে, যা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়েছে রাজ্যে।
সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল প্রার্থী ও এজেন্টদের গণনাকেন্দ্র না ছাড়ার নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, এটি নাকি বিজেপির পরিকল্পিত কৌশল। তাঁর কথায়, “দয়া করে কোনও (তৃণমূল) প্রার্থী এবং কাউন্টিং এজেন্ট গণনাকেন্দ্র ছেড়ে আসবেন না। এটা বিজেপির প্ল্যান।” এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কারণ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
গণনার প্রাথমিক পর্যায়ে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে বিজেপি ১৮০-র বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল পিছিয়ে রয়েছে শতাধিক আসনে। এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসতেই তৃণমূল শিবিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত। তবে এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কর্মী-সমর্থকদের মনোবল না ভাঙার বার্তা দিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফল পাল্টে যাবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন।
মমতার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা। তাঁর দাবি, গণনার প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বচ্ছতা তৈরি করা হচ্ছে এবং কিছু আসনের ফলাফল দেরিতে প্রকাশ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় গণনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এমনকি কল্যাণীর একটি নির্দিষ্ট ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন, যেখানে সাতটি ইভিএম নিয়ে অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। যদিও এই দাবির কোনও স্বাধীন যাচাই এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
এছাড়াও, মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের তীর কেন্দ্রীয় বাহিনীর দিকেও। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের একাংশ নাকি কেন্দ্রের নির্দেশে কাজ করছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও দাবি করেন, রাজ্য পুলিশের ভূমিকা দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। এই ধরনের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, এখনও গণনার অনেক রাউন্ড বাকি রয়েছে এবং চূড়ান্ত ফলাফল ভিন্ন হবে। তাঁর কথায়, “সূর্যাস্তের পরে আপনারা জিতবেন… মন খারাপ করার কারণ নেই।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, তৃণমূল এখনও বহু আসনে এগিয়ে রয়েছে, যদিও তা প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ।
আরও পড়ুন: তৃণমূলের হার নিশ্চিত হতেই গণনা কেন্দ্র ছাড়লেন রাজ চক্রবর্তী! পরাজিত সাংসদের গায়ে ছোড়া হল কাদা, উঠল ‘চোর চোর’ স্লোগান!
শেষে মুখ্যমন্ত্রী আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, “বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করে যাবো।” এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে যেমন শক্ত অবস্থান দেখানোর চেষ্টা, তেমনই বিরোধীরা একে পরাজয় ঢাকার কৌশল বলেও কটাক্ষ করছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, ভোটগণনার এই অস্থির পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত ফলাফল কোন দিকে যায়, আর মমতার এই আত্মবিশ্বাস বাস্তব ফলাফলে প্রতিফলিত হয় কি না, সেই দিকেই নজর গোটা রাজ্যের।




