“যেখানেই গিয়েছি জনতার প্রতিক্রিয়াই বলে দিচ্ছে ভোটের ফল” দাবি ছিল মেগাস্টার দেবের! তৃণমূলের প্রচারে অভিনেতা দেখতে জনস্রোত, কিন্তু ভোটবাক্সে উল্টো ছবি! গণনার শেষে নিজের ঘাঁটি ঘাটালেই ধাক্কা খেলেন তিনি!

ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজ্য রাজনীতির উত্তাপ বাড়তেই প্রচারের ময়দানে নেমেছিলেন টলিউড সুপারস্টার দেব। সিনেমার ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে তিনি উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, একের পর এক জেলায় দলীয় প্রার্থীদের হয়ে সভা করেছেন। প্রচারে কোথাও হেলিকপ্টারে, কোথাও গাড়িতে, আবার কোথাও পায়ে হেঁটে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছেন তিনি। দেবকে দেখতে বহু জায়গায় উপচে পড়েছিল ভিড়। বহু মানুষ শুধু তাঁর এক ঝলক দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। প্রচারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেব নিজেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, “যেখানেই গিয়েছি জনতার প্রতিক্রিয়াই বলে দিচ্ছে ভোটের ফল।” সেই মন্তব্য ঘিরে তখন জোর চর্চা শুরু হয়েছিল। তবে ফল ঘোষণার দিন ছবিটা বদলে যায়। জনসমর্থনের ছবি ভোটবাক্সে ধরা পড়ল কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

নিজের সাংসদ এলাকা ঘাটালে তৃণমূল প্রার্থী শ্যামলী সর্দারের হয়ে বিশেষভাবে প্রচারে নামেন দেব। স্থানীয় স্তরেও তিনি একাধিক সভা করেন এবং ভোটারদের সমর্থন চান। কিন্তু ফল প্রকাশের শুরু থেকেই বিজেপি প্রার্থী শীতল কপট এগিয়ে যেতে থাকেন। প্রথমে কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধান থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যবধান আরও বাড়তে থাকে। যা তৃণমূল শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেবের মতো জনপ্রিয় মুখকে সামনে রেখে প্রচার চালিয়েও ঘাটালে প্রত্যাশিত ফল না আসায় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নিজের পরিচিত এলাকায় এমন ফলাফল অনেককেই বিস্মিত করেছে। দেবের উপস্থিতি ভোটে কতটা প্রভাব ফেলল, সেই প্রশ্নও উঠছে।

শুধু ঘাটাল নয়, রাজ্যের আরও বেশ কিছু জেলায় দেব তৃণমূলের হয়ে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন। কোচবিহার, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান-সহ নানা জায়গায় তাঁর সভায় মানুষের ঢল নেমেছিল। অনেকে মোবাইলে ছবি তুলেছেন, কেউ সেলফির আশায় ছুটেছেন, আবার কেউ তাঁর সামনে পৌঁছতে না পেরে হতাশ হয়েছেন। দেবকে ঘিরে আবেগ যে এখনও প্রবল, তা প্রচারের মাঠে স্পষ্ট ছিল। তবে ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, সেই সব জায়গার অনেক ক্ষেত্রেই গেরুয়া শিবির এগিয়ে রয়েছে। ফলে জনসমাগম আর ভোটের সমীকরণ যে সবসময় এক নয়, সেই বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে। ভিড় মানেই ভোট নয়, এই পুরনো কথাই যেন আবার মনে করিয়ে দিল এবারের ফলাফল।

আরও পড়ুন: ‘সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, জয় আমাদেরই…বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করে যাবো’ গণনায় পিছিয়ে থেকেও আত্মবিশ্বাসী মমতা ব্যানার্জি! নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কারচুপির ইঙ্গিত, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকাতেও তোপ, এ কি পরাজয়ের আশঙ্কায় আগাম চাপ তৈরির কৌশল?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দেবকে ঘিরে মানুষের আগ্রহের বড় অংশটাই ছিল তাঁর তারকা পরিচিতিকে কেন্দ্র করে। তিনি দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় অভিনেতা, ফলে সাধারণ মানুষ তাঁকে কাছ থেকে দেখতে চান, এটা স্বাভাবিক। অনেকে মনে করছেন, সেই জনস্রোত পুরোপুরি রাজনৈতিক সমর্থনের ছবি ছিল না। বরং “খোকা” দেবকে দেখার উন্মাদনাই বেশি কাজ করেছে। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, তারকা জনপ্রিয়তাকে কি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল? ভোটের আগে যেভাবে জনসমাগম দেখে আশাবাদী হয়েছিল দলীয় শিবির, ফলাফলের পর সেই হিসেব মিলছে না। এতে ভবিষ্যতের প্রচার কৌশল নিয়েও নতুন করে ভাবতে হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলিকে।

দেবের রাজনৈতিক জীবন এক দশকেরও বেশি সময়ের। এই সময় তিনি বারবার সংযত ভাষায় প্রচার করেছেন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে দূরে থেকেছেন। বিরোধীদের বিরুদ্ধে কটু মন্তব্য না করে উন্নয়ন ও কাজের হিসেব তুলে ধরাই ছিল তাঁর প্রধান কৌশল। ব্যক্তিত্ব ও ভদ্র আচরণের জন্য রাজনীতির বাইরেও তিনি প্রশংসিত। কিন্তু এবার সেই গ্রহণযোগ্যতা ভোটে কতটা কাজে লাগল, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। নিজের ঘাঁটিতে তৃণমূল পিছিয়ে পড়ায় নতুন সমীকরণ সামনে এসেছে। ফলে এখন রাজনৈতিক মহলের বড় প্রশ্ন, দেবের জনপ্রিয়তা কি এখনও শুধুই তারকা দেবকে ঘিরে, নাকি ভোটের ময়দানেও তার একই শক্তি রয়েছে।

RELATED Articles