‘যতই বড় হও না কেন,পা দুটো মাটিতে রাখতে হবে’, কালিকাপ্রসাদের স্মৃতি হাতড়ালেন লোকগীতি শিল্পী পৌষালী ব্যানার্জি

Poushali Banerjee: লোকমানের জগতে এক উল্লেখযোগ্য নাম পৌষালী ব্যানার্জি (Poushali Banerjee)। সবসময় হাসিখুশি, একেবারে মাটির মানুষ তিনি। তার জীবনে কালিকাপ্রসাদের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। সাক্ষাৎকারে তার কর্মজীবন গায়িকা হিসেবে থান পাওয়া নিয়ে কথা বললেন পৌষালী ব্যানার্জি (Poushali Banerjee)। শান্তিনিকেতনে গৃহবধূ থেকে আজকের পৌষালী ব্যানার্জির সামনে দর্শকাসন উপচে পড়া ভিড় কেমন লাগে গায়িকার। পৌষালী বলছেন,”আমি স্বপ্নে ভেবেছিলাম আমি গান গাইবো। সামনে দশটা কিংবা দশ হাজার লোক শুনবে। এ স্বপ্নটা যখন পূরণ হতে দেখি তখন আমি পুরো ব্ল্যাকআউট থাকি। তখন শুধু আমি থাকি আর শ্রোতারা থাকে। ‌ এটাকে যদি সাকসেসফুল বলা হয়, তাহলে আমি সাকসেসফুল।”

গায়িকা পৌষালী ব্যানার্জীর (Poushali Banerjee) জীবনে কালিকাদার প্রভাব কতটা। গায়িকা বলছেন, “কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে প্রথম দেখা আমার অডিশনে। দেখে তো ভয় পেয়ে গেছি, কি প্রশ্ন করবে, কোন উত্তর দিতে পারবো না। আমাকে প্রথম বলেছিল যে রাই জাগো গো গানটা তুলে শোনাতে। ১০ মিনিট সময় আমি গানটা তুলে শুনিয়েছি। সেটা জানার কর্মস্থলে এসে ঢুকবে সেটা বুঝতে পারিনি। এখন লোকগান আমার নেশায় পরিণত হয়েছে, আমি ওটা ছাড়া বেরোতে পারব না।”

সাক্ষাৎকারে কালিকাপ্রসাদের চলে যাবার স্মৃতি হাতরে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন পৌষালী ব্যানার্জি (Poushali Banerjee)। তিনি বলেন, “বুঝতে পারিনি কালিকাদা চলে যাবে। আগের দিন রাতে আমার সাথে বসে রিহার্সাল করল ২০১৭ সালের ৬ মার্চ। আমাকে একটা গাজনের গান দেওয়া হয়েছিল রিয়েলিটি শোতে। গাজনের গান ছেলেরা গায়, মেয়েরা গায় না। ‌ সবাই তখন বলেছিল এটা নিয়ে একটা সমস্যা হতে পারে। কালিকাদা কখন হেসে হেসে বলেছিল,’ওকে তো আমাদের কোন দিক থেকে মেয়ে মনে হয়না। ও তো ছেলে হতে হতে মেয়ে হয়ে গেছে’। আমি গাজনের গানটা গেয়ে শোনালাম রাত আড়াইটার সময় কালিকাদাকে। আমি বলেছিলাম তুমি বুঝতে পারছ আমি গানটা গাইতে পারবো না এলিমিনেশন রাউন্ড আমি চলে যাব। তারপরে আমি ফোনটা সাইলেন্ট করে কানে হেডফোন দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। দাদার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে ৮:৪০-৪৫ -এ। দাদা আমাকে ফোন করেছিল ৮:১০-এ। আমি ফোনটা ধরতে পারিনি। আমি যখন শুনলাম কালিকাদার গাড়িটা এক্সিডেন্ট করেছে গুড়াপের কাছে। শুনলাম কালিকাদা শুধু মারা গেছেন, বাকি সবাই সুস্থ আছেন।”

পৌষালী (Poushali Banerjee) আরও বলেন, “ছোটবেলা থেকে কখনো কিছুই সাজিয়ে পাইনি, সবকিছুই আমাকে কষ্ট করে পেতে হয়েছে। কালিকাদাকে দেখে আমার একটা লোভ জন্মে গেছিল যে, এই মানুষটার হাত ধরে আমি অন্তত বৈতরণী পার হয়ে যাব। ঠিক যে সময় আমার পারফরমেন্সের গ্রাফটা উঠছে, সেই সময় কালিকাদা চলে গেল। ভেবেছিলাম আমি পারবো না শো থেকে বেরিয়ে যাবো। কালিকাদার আমার প্রতি একটা অগাধ বিশ্বাস ছিল সেটা আমার জেদে পরিণত হয়েছিল। ভেবেছিলাম মাটির গান নিয়ে আমি দেশ-বিদেশে ঘুরবো। মাটিতেই শুরু, মাটিতেই শেষ”। আগামী ৫ বছরের লোকসংগীতকে একটা ঠিকঠাক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করবেন গায়িকা। তার কথায়, “লোকসংগীত অনাথ হয়ে পড়ে রয়েছে। ‌ যতদিন আমি বেঁচে থাকব ততদিন এই অনাথ থেকে মাতৃপরিচয় বা পিতৃ পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করব।”

আজও প্রত্যেকটি শোয়ের শুরুতে কালিকাদাকে উৎসর্গ করে ‘রাই জাগো গো’ গানটি গান পৌষালী ব্যানার্জি (Poushali Banerjee)। যারা স্টেজ শো করেন তাদের বেসিক ডিসিপ্লিন কি হওয়া উচিত বলে পৌষালী মনে করেন। গায়িকার উত্তর, “আলয়েস ট্রাই টু বি গ্রাউন্ডেড (Always try to be grounded)। যেকোন ভাষা, যেকোন জনারের গান গাও, পা দুটো মাটিতে রাখতে হবে। আমি যখন রিয়েলিটি শো থেকে বেরিয়েছিলাম নিজেকে ভীষণ বড় হিরো মনে করছিলাম। হাতে টাকা, চারিদিকে সেলফি। বুঝতে পারছি ভুল করেছি। মা আমার সাথে কথা বলছে না, বাবা কেমন একটা এটিটিউড করছে। তুমি তো ভীষণ বড় নিজেকে হিরো মনে করছ, তোমার সাথে কথা বলাই যাচ্ছে না- মায়ের এই কথা নাড়া দিয়েছিল।”

অনেক সময় দর্শকদের থেকে খারাপ মন্তব্য আসে। এমন একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করে গায়িকা (Poushali Banerjee) বলেন, “আমি এমন একটা জায়গায় গান গাইতে গিয়েছি, রাই জাগো গো দিয়ে গানটা শুরু করেছি। গানটা শেষ হয়েছে সবাই হরিবল হরিবল শুরু করেছে। সামনে বসে একটা বৃদ্ধ লোক বলল ‘হিজড়ে কোথাকার’। ২০২৪ এ দাঁড়িয়ে আমি এই কথাটা কখনো খারাপ ভাবে নিইনি,ওনার মনে হয়েছে ওই কথাটা বললে আমি খারাপ হব বা এই কথাটা বললে আমি রিয়াক্ট করব। কিন্তু আমি রিয়েক্ট করিনি।” ‌

আরো এক ঘটনা আর অভিজ্ঞতার শেয়ার করেন তিনি (Poushali Banerjee)। বলেন, “গান গাইতে হঠাৎ আধ খাওয়া ভুট্টা আমাকে ছুঁড়ে মেরেছে। নাকি আনন্দে ছুড়ে মেরেছে। কিন্তু এটা ক্যামেরার সামনে আসে না। আমি কি রিয়াক্ট করছি সেটা ক্যামেরার সামনে আসে, কাকে ছোট করছি সেটা আসে। হয়তো গান গাইতে গাইতে আঁচলটা একটু সরে গেল। ‌ লোকে বলবে ওই শাড়ির আঁচল সরিয়ে গান শোনাচ্ছে। আগে ছটি সেফটিপিন দিতাম শাড়িতে, এখন এই ভয়ে বারোটা সেফটিপিন দি”।

RELATED Articles