Review: অনির্বাণ ভট্টাচার্যর সিগনেচার স্টাইলের সাথে সোহিনী সরকারের দুর্দান্ত অভিনয়ে অনবদ্য মন্দার!

ওয়েব সিরিজ : মন্দার
পরিচালক : অনির্বাণ ভট্টাচার্য

খিদে, আমাদের এই পৃথিবীর এমনই এক জিনিস যা মানুষকে মানুষ রাখতে পারে না। আমাদের প্রত্যেকের খিদে ক্রমশই উচ্চাকাঙ্খী। কারোর সেটা ক্ষমতার, কারোর কামনার, কারোর বা প্রতিশোধের আগুনের। সিরিজের প্রতিটা চরিত্রের পরতে পরতে উঠে এসেছে এই ভয়ানক এক সত্যের বাতাবরণ।

শেক্সপিয়ার লেখা ম্যাকবেথ নাটকের পাতায় যেমন এক অন্যরকম একটা পরিবেশ যেখানে ক্ষমতার লোভ , মানুষের মনের বাসনা, আর এক অদম্য শাসক হওয়ার ইচ্ছে। তেমনি মন্দার পরিবেশ এক সুবিশাল খিদের পৃথিবী। যেখানে কেউ কামনার খিদে, কারো শাসনের। নাটকের প্রতিটা লাইনের মধ্যেকার যে অন্তর্নিহিত অর্থ এত নিখুঁত ভাবে ফুটে উঠেছে।

“Fair is Foul, Foul is Fair ” থেকে “the instrument of darkness tell us the truth” অসাধারণ এই লাইন যখন মন্দার সিরিজে উঠে এলো “তুই ও পাবি পঞ্চাশ , তুইও পঞ্চাশ, তুই রাজা, কেউ রাজার বাপ।”

পাশাপাশি ম্যাকবেথ নাটকের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল হ্যালুসিনেশন। ম্যাকবেথ রাজা ডানকান কে খুন করার আগে যেমন ছুরি নিজের দিকে আসতে দেখেছে, কিংবা ব্যাংকোর ভুত যে ভাবে ম্যাকবেথ ভয়ের কারণ ছিল মন্দার সিরিজের তার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে।

অভিনয় নিয়ে আলাদা আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে। পরিচালক অনির্বাণ কেন অন্যদের থেকে আলাদা ভাবে নিজেকে চিনিয়ে দিয়ে গেল সেটার অন্যতম উদাহরণ সোহিনী সরকার, দেবেশ বাবু, এবং দেবাশিস মণ্ডল।সোহিনী সরকার আক্ষরিক অর্থেই লেডি ম্যাকবেথ। শেক্সপিয়ার ম্যাকবেথ নাটকে লেডি ম্যাকবেথ ছিলেন স্বামীর প্রতি ভালোবাসা এবং ক্ষমতার বাসনার অধিকারী, অন্যদিকে মন্দাররের সোহিনী সরকার কামনা এবং ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।লেডি ম্যাকবেথ থেকে লায়লি কিংবা নাটকের স্লিপ ওয়াকিং থেকে রক্তের দাগ মুছতে বারবার কাপড় কাচা, এক কথায় অসাধারণ। লেডি ম্যাকবেথ চরিত্র নিপুণ ভাবে বুনন হয়েছে প্রতিটি মুহূর্তে।

রাজা ডানকান এবং ডাবলু ভাই যে সমার্থক সেকথা নিশ্চিত।দেবেশ রায় চৌধুরী বাংলা ইন্ডাস্ট্রির একটা অন্য স্তম্ভ সেটা আরো একবার এই সিরিজে প্রমাণ হলো।ডাবলু সে জানে কিভাবে গেইল পারে শাসন চালাতে হয়, কার হাতে ক্ষমতার সমর্পণ হলে গেইলপুর হোক কিংবা রাজার সিংহাসন যেন অক্ষত থাকে।

ম্যাকবেথ চরিত্রে দেবাশিস মণ্ডল অসাধারণ। পাশাপাশি পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় দেখে বার বার মনে হয়েছে নিখুঁত চয়ন ঘটেছে।

আলাদা করে নজর কেড়েছে এই সিরিজের অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ এবং মিউজিক। ম্যাকবেথ নাটকে কোরাস ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ন রূপ নিয়েছিল catharsis কিংবা চরিত্রের প্রতিটা পরিবর্তন উঠে এসেছে তেমনি মন্দরের প্রতিটি এপিসোডের মধ্যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক প্রতিশোধ ভরা এই পরিবেশ আরো ভয়ালো করে তুলেছে।

তবে এডাপটেশন হলেও পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য কিছুটা নিজস্বতাও বজায় রেখেছেন। ম্যাকবেথ নাটক আমরা দেখেছি ব্যাংকো এবং ম্যাকবেথ দুজনেই বন্ধু এবং সমবয়স্ক। তাদের দুজনের বন্ধুত্বের রসায়নও যথেষ্ট সুমধুর। কিন্তু এই ক্ষেত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্য নিজস্বতা প্রয়োগ করেছেন। তেমনি ম্যাকবেথ নাটকের রাজা ডানকান ম্যাকবেথ এর উপর অনেক বেশি ভর্সা করতেন, কিন্তু মন্দার সিরিজের শুরুতেই দেখা গেছে ডাবলু ভাই মন্দাররের উপর ভরসা করতে পারেন না কারণ তিনি আগে থাকতেই জানতেন তার ক্ষমতার লোভ আছে।

অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য এই সিরিজে মাকদাফের ভূমিকায় সম্পূর্ন অন্য রূপে অভিনয় করে দর্শকদের চমক দিয়েছেন। চেনা ঘরানা থেকে বেরিয়ে একেবারে নিজস্ব ভঙ্গিমায় অভিনয় করেছেন অভিনেতা অনির্বাণ।

পরিশেষে বলি,
পরিচালক অনির্বাণ নিজের সিগনেচার স্টাইলে মন্দার কে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে, যা এক অর্থে অসাধারণ।সকলের কাছে অনুরোধ মন্দার দেখার,কারণ বাংলা ও টি টি প্ল্যাটফর্মে এরকম ক্লাসিক কাজ আগে কখনো দর্শকরা দেখেনি।

Khabor24x7 Desk

আরও পড়ুন

RELATED Articles