সোশ্যাল মিডিয়া এখন আর শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি ক্যারিয়ার গড়ার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। অনেকেই নিজের প্রতিভার জোরে সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, তবে খুব কম মানুষই আছেন যারা শূন্য থেকে শুরু করে একেবারে শীর্ষে পৌঁছেছেন। এমনই একজন সায়ক চক্রবর্তী। অভিনেতা হিসেবে নিজের কেরিয়ার শুরু করলেও, আজ তিনি শুধু অভিনয় জগতের মানুষ নন, বাংলার প্রথম সারির সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যেও অন্যতম।
কিন্তু এই যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সায়কের জীবন সহজ-সাবলীল ছিল না, ছিল বহু কঠিন অধ্যায়। একসময় যিনি অ্যাসবেস্টসের ঘরে দিন কাটাতেন, তিনিই আজ নিজের বাড়ির মালিক। সোশ্যাল মিডিয়া তাঁর জীবনে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিও এনে দিয়েছে। তাঁর ভ্লগের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের গল্প বলেন না, নিজের ঘনিষ্ঠদের জীবনসংগ্রামও তুলে ধরেন, যা দর্শকদের কাছে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সায়ক জানান, 2014 সাল থেকেই তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ ছিলেন। ইনস্টাগ্রাম চালানো তখন থেকেই শুরু, তবে তখন বিষয়টা ছিল শুধুই বিনোদনের জন্য। কিন্তু লকডাউনের পর যখন সবার জীবনে পরিবর্তন আসে, তখন সায়কও ভেবেছিলেন নতুন কিছু করার কথা। তিনি বলেন, “লকডাউনে বাড়িতে বসে কিছুই করছিলাম না। তখন দেখি সবাই ডালগোনা কফি বানাচ্ছে। আমিও শখের বশে বানিয়ে ভিডিয়ো করলাম। তারপর দেখি মানুষ আমার কথা শুনতে শুরু করেছে, ভিডিয়োগুলো পছন্দ করছে। তখন থেকেই একটার পর একটা ভিডিয়ো বানাতে শুরু করি।” প্রথমে তিনি শুধুমাত্র ইউটিউবে কন্টেন্ট বানাতেন, ফেসবুকে খুব একটা দিতেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন যে দর্শকদের কাছে পৌঁছনোর জন্য ফেসবুকও একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। তখন থেকেই ফেসবুকে নিয়মিত ভ্লগ আপলোড করা শুরু করেন। আর তারপরই আসে বিশাল জনপ্রিয়তা। আজ তিনি লাখ লাখ মানুষের পছন্দের কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
অনেকের মনে হতে পারে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা জনপ্রিয় হন, তাঁদের জীবনে হয়তো খুব একটা স্ট্রাগল নেই। কিন্তু সায়কের জীবনের গল্প একেবারেই অন্যরকম। তিনি জানান, “আমি অভিনয় জগতে আসার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু তখন আমাদের সংসার চালাতেন আমার মাসি। দাদাও তখন নতুন চাকরি পেয়েছে, সেখান থেকে সামান্য কিছু টাকা পাঠাতো। আমরা তখন অ্যাসবেস্টসের ঘরে ভাড়া থাকতাম। সেই সময় থেকে এখন নিজের বাড়িতে চলে এসেছি, এটা অবশ্যই বড় একটা পরিবর্তন। কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রা পাল্টালেও, আমাদের পরিবারিক বন্ধন এখনও একই আছে।” অভিনেতা থেকে ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে ওঠার পিছনে শুধু ভাগ্যের হাত ছিল না, ছিল কঠিন পরিশ্রম। সায়ক বলেন, “যখন কাজ ছিল না, তখন সোশ্যাল মিডিয়া আমাকে ব্যাকআপ দিয়েছে। আমার ফ্ল্যাটের লোন শোধ করা থেকে শুরু করে সবকিছু এই প্ল্যাটফর্ম আমাকে সাহায্য করেছে।”
আরও পড়ুনঃ যাদবপুরে ফের ‘র্যাগিং’ বিতর্ক! ছাত্রের অভিযোগে চাঞ্চল্য, পাল্টা আঘাতের অভিযোগে ধোঁয়াশা
সায়ক আজ একজন প্রতিষ্ঠিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর হলেও, অভিনয় তাঁকে এখনও টানে। তিনি কৃষ্ণের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যা দর্শকরা খুব পছন্দ করেছিলেন। তবে তিনি বলেন, “আগে মানুষ শান্ত স্বভাবের লোকজনকে বেশি গুরুত্ব দিত, এখন উলটোটা। এখন যদি কাউকে বোঝাতে হয়, তাহলে রাগ দেখাতেই হবে! কৃষ্ণের চরিত্রটা করার সময় যা শিখেছিলাম, এখন মনে হয় সবটাই বদলে গেছে।” তবে তিনি এটাও মনে করেন যে, সোশ্যাল মিডিয়া বিনোদনের ধরণ বদলে দিয়েছে। আগে মানুষ শুধুমাত্র টিভি দেখত, এখন মোবাইলের মাধ্যমেই বিনোদন খুঁজে নেয়। তাঁর কথায়, “আমার মা আগে সারাদিন সিরিয়াল দেখত, এখন মোবাইলেই দেখে নেয়। অনেকেই এখন মোবাইলেই সিরিয়াল দেখতে পছন্দ করে, তাই অ্যাপে সিরিয়াল আপলোড হলে টি আর পি-তে তার প্রভাব পড়বে না। বরং দর্শকদের সুবিধা হবে।”
সায়ক মনে করেন, ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়াই হবে বিনোদনের মূলধারা। “এখন শুধু সেলিব্রিটিদের জন্য নয়, অনেক সাধারণ মানুষের জন্যও এই প্ল্যাটফর্ম সুযোগ করে দিচ্ছে। যারা শূন্য থেকে শুরু করেছে, তাদের জন্য একটু বেশি কঠিন, তবে সুযোগ সবার জন্যই আছে।” অভিনয়ের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের দাপট বজায় রেখেছেন সায়ক। তিনি বলেন, “এখন এটা ছাড়তে পারব না। এটা শুধু আমার প্যাশন নয়, আমার জীবনযাত্রার বড় অংশ।” তাঁর গল্প শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয়, একজন সংগ্রামী মানুষের সাফল্যের কাহিনি, যা অনুপ্রাণিত করে লাখ লাখ অনুরাগীকে।





