কলেজ জীবন মানেই স্বাধীনতা, নতুন বন্ধুত্ব, অজানা অভিজ্ঞতার স্বাদ। কিন্তু কখনও কখনও এই অভিজ্ঞতা পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল জীবন, যেখানে একদিকে থাকে বন্ধুত্বের উষ্ণতা, অন্যদিকে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ঙ্কর কিছু মুহূর্ত। সিনিয়রদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে কখনও কখনও জুনিয়রদের সম্মুখীন হতে হয় অস্বস্তিকর পরিস্থিতির, যা অনেক সময় র্যাগিংয়ের রূপ নেয়। র্যাগিং নিয়ে বহুবার সরব হয়েছে সমাজ, শাস্তি নির্ধারণের জন্য কড়া আইনও হয়েছে। তবু, কিছু ঘটনা বারবার প্রমাণ করে দেয়, সমস্যাটি এখনও সমাধান হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে র্যাগিংয়ের কুপ্রভাব কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার উদাহরণ আমরা আগেও দেখেছি। ২০২৩ সালের ৯ অগাস্ট যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রথম বর্ষের ছাত্র হোস্টেলের তিন তলা থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারান। সেই ঘটনার পর র্যাগিং বিরোধী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছিল সর্বস্তরে। তবু, বারবার ফিরে আসে একই অভিযোগ। ফের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আলোচনার কেন্দ্রে— এবারও অভিযোগ র্যাগিংকে ঘিরেই। তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। অভিযোগ শুধু র্যাগিং নয়, অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই উঠেছে পাল্টা হামলার অভিযোগ। আর এতে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের এক ছাত্রের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ওই ছাত্রের দাবি, তিনি হোস্টেলের A 1 ব্লকের পঁচিশ নম্বর ঘরে এক পরিচিতের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর বন্ধু ঘর থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু যখন ফেরেন, তখন তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। এরপরই পুরো গ্রুপ একসঙ্গে ঘরে ঢোকে এবং অভিযোগকারী ছাত্রকে অকথ্য গালিগালাজ করতে শুরু করে। এমনকি, তাঁর মাকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। তিনি মনে করেন, এই ঘটনা পরিকল্পিত এবং অতীতের এক ঘটনার প্রতিশোধ নিতে করা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ভাঙড়ে পুলিশের উপর তাণ্ডব! জমি বিবাদ থেকে রণক্ষেত্র, রাস্তায় ফেলে চড়–কিল–ঘুষি অভিযানে চরম চাঞ্চল্য
অভিযোগকারী ছাত্র আরও বলেন, ৯ অগাস্টের ঘটনার পর থেকে তিনি র্যাগিং বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর মতে, ওই ঘটনার জন্য দায়ী ছাত্রদের একটি দল বারবার এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু চাঞ্চল্য তখনই আরও বাড়ে, যখন দেখা যায়, এই ছাত্রের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক অধ্যাপক তাঁর বিরুদ্ধে হেনস্তার অভিযোগ এনেছেন। অধ্যাপকের অভিযোগ, গত ২ মার্চ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ চলার সময়, পিছন থেকে এসে ওই ছাত্র তাঁকে সজোরে লাথি মারেন।
এখন প্রশ্ন, আদৌ কি এটি র্যাগিং, নাকি ব্যক্তিগত আক্রোশের প্রতিফলন? বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভাস্কর গুপ্ত এই অভিযোগগুলির তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ‘‘অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটির তদন্ত হবে। এটিকে র্যাগিং বলা যাবে কি না, তা নিয়েও ভাবার বিষয় রয়েছে।’’ তবে একদিকে ছাত্রের অভিযোগ এবং অন্যদিকে অধ্যাপকের পাল্টা অভিযোগ— গোটা বিষয়টিকে ঘিরে বিতর্ক আরও গাঢ় হয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং বন্ধ হবে কি না, বা এই অভিযোগগুলির সত্যতা কতটা, সেটি স্পষ্ট হবে তদন্তের পরেই। কিন্তু একের পর এক ঘটনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে যে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।





