পরিবারের কেউ নিখোঁজ হয়ে গেলে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা যাঁরা ভুক্তভোগী তাঁরাই জানেন। দিন কাটে অপেক্ষায়, একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে। কখনও খবর আসে, কখনও আশাও শেষ হয়ে যায়। আর যদি হঠাৎ একদিন জানা যায়, সেই নিখোঁজ মানুষটি আর নেই, তখন জীবন বদলে যায় চিরতরে। পরিবারের এক সদস্যকে চিরতরে হারানোর শোক, কষ্ট, সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে বাস্তবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
তবে শোক কাটিয়ে যখন নতুন করে বাঁচার চেষ্টা চলছে, তখন যদি সেই ‘মৃত’ ব্যক্তি হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়ান? অবিশ্বাস্য লাগছে? এমনই এক ঘটনা ঘটেছে, যা এক পরিবারের আবেগকে ওলটপালট করে দিয়েছে। তাঁদের যাঁকে মৃত বলে মনে করা হয়েছিল, শেষকৃত্য পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছিল, তিনিই ফিরে এসেছেন! এমন এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গিয়েছে পুলিশও।
ঘটনার শুরু এক যুবতীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। বহু খোঁজাখুঁজির পরও যখন তাঁর সন্ধান মেলেনি, তখন পরিবারের মনে নানা শঙ্কা দানা বাঁধে। কিছুদিন পর পুলিশ জানায়, এক অজ্ঞাতপরিচয় দেহ উদ্ধার হয়েছে। শরীর ছিল বিকৃত অবস্থায়, তাই মুখ দেখে শনাক্ত করার উপায় ছিল না। কিন্তু হাতে থাকা ট্যাটু এবং পায়ে বাঁধা কালো সুতো দেখে পরিবারের লোকজন নিশ্চিত হন, এটি তাঁদের মেয়ের দেহ। এরপর তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পরিবারের তরফে খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে চার যুবককে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করা হয়, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাদের শাস্তিও হয়। চার যুবক তখন থেকে জেলে দিন গুনছে। পরিবার ভেবেছিল, দোষীদের সাজা হয়েছে, এবার জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে নিতে হবে।
এতদিন পর্যন্ত সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু ১৮ মাস পর এক সকালে বাড়ির দরজায় এসে কড়া নাড়লেন সেই মেয়েই, যাঁর ‘মৃত্যু’ হয়েছিল! প্রথমে তাঁকে দেখে হতভম্ব হয়ে যান পরিবারের লোকজন। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি তাঁদেরই পরিচিত! সেই মুহূর্তে শোক, বিস্ময়, ভয়—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।এরপর পুলিশের দ্বারস্থ হয় পরিবার। তখনই প্রকাশ্যে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—ঘটনাটি মধ্যপ্রদেশের মন্দসৌর জেলার। ‘মৃত’ মেয়েটির নাম ললিতা বাই। পুলিশ ও পরিবার যাঁকে মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, তিনি আদৌ মরেননি, বরং এই ১৮ মাস ধরে এক অজানা জায়গায় বন্দি ছিলেন!
আরও পড়ুনঃ কঠিন লড়াই, হার না মানার জেদ! কীভাবে সায়ক চক্রবর্তী হয়ে উঠলেন সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন?
ললিতা জানান, এক পরিচিত যুবকের সঙ্গে তিনি ভানুপাড়া এলাকায় যান। সেখানে তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিক্রি করে দেওয়া হয় অন্য এক ব্যক্তির কাছে, যার নামও শাহরুখ! ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রির পর তাঁকে কোটার একটি এলাকায় আটকে রাখা হয়। এতদিন ধরে বন্দি থাকার পর, সুযোগ পেয়ে কোনওভাবে পালিয়ে আসেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখেন, তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ললিতার ফিরে আসার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, যে দেহটি পাওয়া গিয়েছিল, সেটি যদি ললিতার না হয়, তবে কার ছিল? দ্বিতীয়ত, চার যুবক কি নির্দোষ? যদি তারা খুন করে না থাকে, তবে আসল খুনি কে?
গান্ধী সাগর থানার আধিকারিক তরুণা ভরদ্বাজ জানিয়েছেন, “ললিতা থানায় এসে বিস্তারিত জানিয়েছেন। বিষয়টি উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নতুন করে তদন্ত শুরু হবে।”এই ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে বিচার ব্যবস্থার দিকেও। যদি ভুল প্রমাণের ভিত্তিতে চারজনকে জেলে পাঠানো হয়, তাহলে তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে গেল না? এক ভুলের জন্য ১৮ মাস ধরে নির্দোষরা শাস্তি পেল, অথচ আসল সত্য সামনে এল এতদিন পর! এখন দেখার, নতুন তদন্তে কী উঠে আসে এবং চার যুবকের ভবিষ্যৎ কী হয়।





