বাংলা মানেই হাজারো প্রতিভার ছড়াছড়ি। সে পড়াশোনার ক্ষেত্র হোক বা কোনও শিল্পকলা, সব জায়গাতেই বাঙালির জয়জয়কার শোনা যায়। কত যে প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রী এই বাংলার বুকে রাজ করছেন, তা হয়ত ভাবাও যাবে না। আর আজকের এই প্রতিবেদনে উঠে আসবে এমনই এক প্রতিভার কাহিনী।
তাঁর নাম সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় খলনায়িকা তিনি। তাঁর হাসি থেকে চোখের চাউনি, সবেতেই যেন এক নেগেটিভ চরিত্রের ছাপ ফুটে উঠত। কিন্তু এই অভিনেত্রী কোনওদিনই অভিনয় জগতে আসতে চান নি। বরং প্রেসিডেন্সি কলেজের এই মেধাবী পড়ুয়া চেয়েছিলেন প্রফেসর হতে।
তাঁর জন্ম হয় ১৯৫৬ সালের ৮ই আগস্ট বেনারসে। বাবা ছিলেন সুভাষ কুমার মুখোপাধ্যায় এবং মা সান্ত্বনা মুখোপাধ্যায়। এরপর তিনি চলে আসেন কলকাতায়। ছোট থেকেই অদম্য জেদ ছিল সংঘমিত্রার মধ্যে। মেয়েরা যে ছেলেদের থেকে কোনও ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই, তা প্রমাণ করার জন্য মন দেন পড়াশোনায়। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সংস্কৃত অনার্স পাশ করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে স্পেশাল ডিপ্লোমা করেছেন। চেয়ে ছিলেন কলেজের প্রফেসর হতে।
পড়াশোনার পাশাপাশি শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং কত্থকেও তালিম নিয়েছেন সঙ্ঘমিত্রা। নাচ শিখেছেন নামিদামি নৃত্য গুরুর কাছে। ১৯৮১ সালে ভারতীয় সংস্কৃতির ডেলিগেট হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যান সংঘমিত্রা। এছাড়া টোকিওতে ক্লাসিকাল ডান্সে পান ডিপ্লোমা।
অভিনেত্রী হিসেবে প্রথমেই তিনি সুযোগ পান মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করার। উত্তম কুমার তাঁর পরিচালিত ছবি ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’র জন্য নতুন মুখের সন্ধান করছিলেন। সঙ্ঘমিত্রা তাঁকে অডিশনে দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিন নিজেই যে এভাবে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে যাবেন, তা তিনি ভাবতেও পারেন নি। প্রথম শটেই সঙ্ঘমিত্রাকে পছন্দ হয়ে যায় উত্তম কুমারের। এরপর তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
এরপর ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’ ছবিতে রামজি দাসী সাধিকার ভূমিকায় অভিনয় করে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। প্রতিষ্ঠা পান টলিউডের জাঁদরেল খলনায়িকা হিসেবে। তিনিই হয়ত বাংলা সিনেমার প্রথম খলনায়িকা যিনি কিনা উচ্চশিক্ষিতা ও রূপসী।
এরপর একে একে ‘ছোটো বউ’, ‘বিধিলিপি’, ‘বৌদি’, নানান ছবিতে তাঁর খলনায়িকার অভিনয় দেখে দর্শকদের মধ্যে রাগের সঞ্চার হত বেশ। আর সেখানেই অভিনেত্রীর সাফল্য।
সঙ্ঘমিত্রার বিয়ে হয় এলাহাবাদের জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। রয়েছে একমাত্র ছেলে অনুরাগ বন্দ্যোপাধ্যায়। রান্না করতে খুব ভালোবাসতেন সঙ্ঘমিত্রা। নিজের জন্মদিন থেকে লক্ষ্মী পুজো সরস্বতী পুজো একা হাতেই নিজের রান্না করতেন সকলের জন্য। ছেলের ৩০ বছরের জন্মদিনে ৩০ ঘণ্টার জন্য পার্টি দেন সঙ্ঘমিত্রা যার রান্না একা হাতে রেঁধেছিলেন তিনি। যেকোনো বড় মাছের হরগৌরী ছিল তাঁর হাতে রাঁধা সেরা পদ।
মানুষকে খুবই ভালোবাসতেন সঙ্ঘমিত্রা। অনেক শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে পড়ার জন্য টাকা দিয়েছেন। বহু বিবাহ যোগ্যা মেয়ের বিয়ের টাকা দিয়েছেন অভিনেত্রী। কত মানুষকে যে তিনি সাহায্য করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
কিন্তু শেষ জীবনে মারণ রোগের শিকার হন সঙ্ঘমিত্রা। ২০১৬ সালের ২৭শে অক্টোবর সংসারের মায়া ত্যাগ করে পরলোক গমন করেন তিনি। পর্দায় তিনি খলনায়িকা হলেও, নিজের আসল জীবনে কিন্তু তিনিই নায়িকা। তাঁকে নিয়ে টলিপাড়ায় কোনও গসিপ শোনা যায় না। তাই তো তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁকে আজও মনে রেখেছে বাঙালি দর্শক।





