পর্দায় তাঁকে যে রূপে দেখা যেত, বাস্তব জীবনে কিন্তু তিনি ছিলেন একেবারেই উলটো। এক গুরুগম্ভীর মানুষ যিনি কি না সময় পেলেই রামকৃষ্ণ কথামৃত পড়ে সময় কাটাতেন। এরই সঙ্গে ছিল প্রবন্ধ-নাটক পড়ার নেশা। প্রথম জীবনে কমিউনিজমে দীক্ষিত ছিলেন বটে, তবে পরবর্তীকালে পড়তেন রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ। নিজের পূজা-অর্চনা না করলেও, অন্যের বিশ্বাসকে ছোটো করতেন না। আজ সেই হাস্যকৌতুক, কিংবদন্তি অভিনেতা রবি ঘোষের জন্মদিন।
লুচি-মাংস ছিল তাঁর প্রিয় খাবার। অন্যকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে বেশ ভালবাসতেন। তবে সমস্যা হত তখনই, যখন সেটা তিনি বাড়িতে বলতে ভুলে যেতেন। রাতে অতিথি বাড়িতে এসে হাজির হলে, বেশ গম্ভীর হয়েই তাদের যত্নের ব্যবস্থা করতেন।
১৯৩১ সালের ২৪শে নভেম্বর কোচবিহারে মামাবাড়িতে জন্ম হয় রবি ঘোষের। তাঁর বাবা জিতেন্দ্রনাথ ঘোষদস্তিদার ছিলেন পূর্ব বাংলার বরিশালের গাভার বাসিন্দা। চাকরিসূত্রে কলকাতার মহিম হালদার স্ট্রিটে থাকতেন। মা জ্যোৎস্নারানি ছিলেন কোচবিহারের সুনীতি অ্যাকাডেমির বৃত্তি পাওয়া ছাত্রী।
রবি ঘোষ পড়াশোনা শুরু করেন কোচবিহারের জেনকিন্স স্কুল থেকে। পরে ১৯৪৭ সকালে কলকাতার সাউথ সাবার্বান স্কুল থেকে পাশ করে ম্যাট্রিকুলেশন। স্কুলে তাঁর সহপাঠী ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমারের ভাই তরুণ চট্টোপাধ্যায়। ১৯৪৯ সালে আইএসসি পাশ করেন আশুতোষ কলেজ থেকে। সেই কলেজেই নৈশ বিভাগে বি কম-এ ভর্তি হন। নিয়মিত করতেন শরীরচর্চা।
তাঁর বাবা অভিনয় করা মোটেই পছন্দ করতেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলতেন তিনি যেন রবি ঘোষকে অভিনয় করতে বারণ করেন। কিন্তু কথা রবি ঘোষ কথা শোনেন নি বাবার। তাঁর মা অবশ্য এই বিষয়ে তাঁকেই সমর্থন করতেন। ১৯৫৩ সালে তিনি কলকাতা ব্যাঙ্কশালে চাকরি শুরু করলেও ১৯৫১ সালে তা ছেড়ে দিয়ে অভিনয়কেই বেছে নেন পেশা হিসেবে।
অভিনয় জীবন শুরু করেন পাঁচের দশকে ‘সাংবাদিক’ দিয়ে। পরিচালনায় ছিলেন উৎপল দত্ত। তাঁর ভূমিকা ছিল এক সংবাদপত্র বিক্রেতার। মঞ্চের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া চরিত্র। মাত্র তিরিশ সেকেন্ডের অভিনয় দেখেই মুগ্ধ হন মৃণাল সেন। এরপর অভিনেতা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শেই উৎপল দত্তের নাটকের দল লিটল থিয়েটারের সংস্পর্শে আসেন রবি ঘোষ।
১৯৫৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর উৎপল দত্তের পরিচালনায় মিনার্ভা থিয়েটারে এলটিজির নিবেদনে ‘অঙ্গার’ নামের নাটকের প্রথম শো ছিল। নাটকের শেষ রজনী পর্যন্ত অভিনয় করেছিলেন রবি ঘোষ। এই শো-এর পাঁচদিন আগে ২৫শে ডিসেম্বর বাবাকে হারিয়েছিলেন তিনি।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ঘটক বিদায়’ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়, উৎপল দত্ত, তরুণ মজুমদার, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়, অজয় কর, সন্দীপ রায়, গৌতম ঘোষ, দীনেন গুপ্ত, মৃণাল সেন, অঞ্জন চৌধুরী, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, ও আরও নানান পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’ ছবি করার সময় তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় তাঁর প্রথম স্ত্রী অনুভা গুপ্তের। সেই সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অনুভাদেবীর শুশ্রূষাতেই সেরে উঠেছিলেন রবি ঘোষ। এরপর দীর্ঘ টানাপড়েনের পর তাদের বিয়ে হলেও, তা বেশিদিন টিকল না। ১৯৭২ সালে অকালে মৃত্যু হয় অনুভাদেবীর।
এর প্রায় এক দশক পর ১৯৮২ সালে রবি ঘোষ বিয়ে করেন বৈশাখীদেবীকে। ততদিনে মহিম হালদার স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে তিনি চলে গিয়েছেন গল্ফগ্রিনের ফ্ল্যাটে। ১৯৯৭ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি জীবনাবসান হয় এই কিংবদন্তি অভিনেতার। অভিনয়কে সঙ্গে নিয়েই জন্ম নিয়েছিলেন তিনি আর সেই অভিনয়কে সঙ্গ করেই মৃত্যু হয় তাঁর।





