আত্মবিশ্বাসের আরেক নাম অরুণিমা! প্রতিবন্ধকতাকে তোয়াক্কা না করে প্রোস্থেটিক পা নিয়েই এভারেস্ট জয় ভারতকন্যার

একটা দুর্ঘটনা, ব্যস সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। ভাঙা পা, শরীরের অজস্র হাড়ও ভাঙা। তবুও লোকের দয়ার পাত্রী হিসেবে বেঁচে থাকতে চায়নি অরুণিমা। আত্মবিশ্বাসের জোরে জয় করেছে মাউন্ট এভারেস্ট, হ্যাঁ প্রোস্থেটিক পা নিয়েই।

সালটা ২০১১, দিন ১২ই এপ্রিল। একরাশ স্বপন বুকে নিয়ে লখনউ থেকে দিল্লির যাওয়ার ট্রেনে ওঠেন এক তরুণী। সিআইএসএফের চাকরিটা মোটামুটি পাকা। জাতীয় স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় সে। স্পোর্টস কোটায় চাকরিটা এই যাত্রায় হয়ে যাবে।

কিন্তু যেমন ভাবা, তেমন আর হয় কোথায়। রাতের ট্রেন, রিজার্ভেশন কামড়াও নয়। সিটের এক পাশে বসে ট্রেনের ঠাণ্ডা হাওয়ায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে মেয়েটি। অমনি গলায় একটা টান অনুভব করতেই জেগে ওঠে। তাঁর গলার দিকে বাড়ানো হাতটা চেপে ধরে সে। ছিনতাইবাজ। তাঁর গলার সোনার চেনটি ছিনতাই করতে এসেছে। অরুণিমা তাঁর হাত চেপে ধরায় অরুণিমাকে একরকম হ্যাচরাতে হ্যাচরাতে ট্রেনের বাথরুমের সামনে নিয়ে যায়। চিৎকার করতে থাকে অরুণিমা। কিন্তু কী আশ্চর্য। ট্রেন ভর্তি লোক। সকলে চেয়ে চেয়ে দেখছে একটা মেয়ে সমানে নিজের সম্বলটুকু বাঁচানোর জন্য প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ এগিয়ে এল না।

সেই ছিনতাইবাজের সঙ্গে ছিল তার আরও দুই সাঙ্গোপাঙ্গ। বিপদ বুঝে তারা সেই তরুণীকে পিছন থেকে টেনে ধরে, হাত মুচড়ে দেয়। পেটে লাথি পর্যন্ত মারে। কিন্তু হাল ছাড়বে না অরুণিমা, এই তাঁর পণ। অরুণিমার উপরেও চলল কিল-চড়-ঘুষি। কিন্তু কোনও কিছুই দমাতে পারছে না অরুণিমার জেদ। শেষ পর্যন্ত সেটাই ঘটল, যা অরুণিমা হয়ত কোনওদিন কল্পনাও করেনি। সেই তিন ছিনতাইবাজ অরুণিমাকে টেনে দরজার সামনে নিয়ে গিয়ে ট্রেন থেকে পোড়া সিগারেট ছুঁড়ে ফেলার মতো ছুঁড়ে ফেলে দিল বছর বাইশের সেই অদম্য জেদি জাতীয় স্তরের খেলোয়াড়কে। এরপরই পাশ থেকে আরও একটি ট্রেন। ছুটল সেই তরুণীর পায়ের উপর দিয়ে। ধুলো হয়ে গেল পায়ের হাড়। কোমরের প্রধান হাড়টাও মড়মড়িয়ে গেল ভেঙে। তরুণী জ্ঞান হারাল। সেই সঙ্গে নিমেষে হারিয়ে গেল তাঁর সমস্ত স্বপ্ন।

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হয়নি। কারণ মেয়েটির নাম যে অরুণিমা সিনহা। মাসকয়েক হাসপাতালের বেডে শুয়ে একটু সুস্থ হয়ে যখন সে ছাড়া পেল, তখন থেকেই শুরু হল তাঁর জীবনের আসল লড়াই। বিরামহীন ট্রেনিং-এর মাধ্যমে নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে প্রোস্থেটিক পা নিয়েই ২০১৩ সালেই মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন তিনি। হ্যাঁ, তিনিই বিশ্বের প্রথম মহিলা অ্যাম্পিউইটি। এখানেই থেমে থাকেনি অরুণিমা। শুরু করেছে নিজের সংস্থা অরুণিমা ফাউন্ডেশন। দুঃস্থ, প্রতিবন্ধী শিশুদের খেলায় উৎসাহ জোগান তিনি। ২০১৫ সালে তিনি ভূষিত হন পদ্মশ্রীতে। পেয়েছেন দেশবিদেশে নানান সংবর্ধনা।

হতাশা, অসম্ভব নামের শব্দগুলিকে তিনি নিজের জীবন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চান। তাঁর এই জয় তিনি উৎসর্গ করেছেন স্বামী বিবেকানন্দকে। যারা জীবনের লড়াইয়ে, সমস্যায় কোনও কারণে হতাশ হয়ে পড়েন, ভেঙে পড়েন নিজের হারের জন্য, তাদের কাছে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হলেন ভারতকন্যা অরুণিমা সিনহা। তাঁর এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে কুর্নিশ।

RELATED Articles