ঘরে ঘরে ফেরে দুলালের তালমিছরি! লাল তালমিছরি দিয়ে আস্থা অর্জন করেন বাঙালি থেকে ইংরেজ সাহেবদেরও, জানেন কী এই দুলাল চন্দ্র ভড়ের আসল পরিচয়?

মিছরি (Mishri) খেতে পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুব কমই আছেন, ছোট থেকে তালমিছরি বলতে আমরা দুলাল চন্দ্রের তাল মিছরি (Dulalchandra Bharer Talmishri) খেয়েই বড় হয়ে উঠেছি। ৯০ দশকের সময় থেকেই দূরদর্শনের পর্দায় আমরা দেখতে পাই দুলালের তাল মিছরির বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপনে শোনা যেত ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠার সময় শুনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া সেই চির পরিচিত কথা- তালমিছরি মানেই দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি।

এই বিজ্ঞাপনে দুলালের তালমিছরির ছবি দেওয়া থাকত আর লেখা থাকত, দুলালের তালমিছরি চির পরিচিত, দুলালের তাল মিছরি কেনার সময় ছবি ও স‌ই দেখে কিনবেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই দুলাল চন্দ্র ভড় আসলে কে? কী বা তার পরিচয়? দুলাল চন্দ্র ভড় ছিলেন হুগলি জেলার রাজবলহাটের বাসিন্দা, তাদের পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসা ছিল। হাওড়া হাটে তাদের একাধিক দোকান ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই সময় বস্ত্র ব্যবসাতে সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠেছিলেন তারা।

সেই সময় পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসার পথে না এগিয়ে নতুন কিছু করতে চেয়েছিলেন দুলাল চন্দ্র ভড়। তারুণ্যের তেজে তিনি তখন নিজস্ব আলাদা একটি পথ তৈরি করতে চেয়েছিলেন আর এই পথে এগিয়ে যেতে তাকে যথেষ্ট উৎসাহ জুগিয়েছেন তার ঠাকুরদা জহর চন্দ্র ভড়। এরপর দুলাল চন্দ্র ভড় শুরু করলেন মিছরির ব্যবসা, তৈরি হল দুলালের তালমিছরি। প্রথমে তিনি বাজারে নিয়ে এলেন দুলালের সাদা তাল মিছিরি, এই মিছরি দিয়েই বাঙালি থেকে শুরু করে সাহেবদের আস্থা অর্জন করলেন তিনি। সেই সময় ঠাকুর ঘর থেকে বাঙ্গালি হেঁশেলে ভীষণভাবে মিছরির ব্যবহার ছিল।

এদেশ ও বাংলাদেশ দুই দেশ মিলে দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল। দেশভাগ হওয়ার পরেও দুই দেশে দুলাল চন্দ্রের তাল মিছরির ব্যবহার দেখা যায়। এই সময় দুলাল বাবুর মাথায় নতুন কিছু করার ভাবনা চিন্তা হল, এতদিন ছিল সাদা তাল মিছরি, এরপর তার মনে হল তালমিছরি যদি লাল করা যায়! এরপর তিনি তৈরি করলেন লাল তালমিছরি! তিনি জোর দিয়েছিলেন উৎপাদন ও বিপণনের উপর- স্বাদে অতুলনীয় তার তৈরি করা এই তালমিছরি বাংলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শুরু করে বাংলার বাইরেও চলে যেত।

বাংলা ছাড়িয়ে বিহার, অসম, উড়িষ্যার মত জায়গায় দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ে দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি। তালের রস দিয়ে তৈরি হত এই তালমিছরি। তমলুকের খাঁটি তাল দিয়ে কারিগররা এই তালমিছরি তৈরি করতেন। বংশানুক্রমে কারিগররা এই ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে পড়তেন। এরপর ২০০০ সালের জুন মাসে প্রয়াত হন দুলাল চন্দ্র ভড়! কিন্তু তার মৃত্যুর পর ২৪ বছর কেটে গেলেও আজও বাঙালি তাল মিছরি বলতে বোঝেন দুলালের তাল মিছরি! কারণ এই দুলালের তাল মিছরির সাথে জড়িয়ে আছে বাঙালির চিরন্তন আবেগ, আস্থা ও বিশ্বাস।

Sangita Chatterjee

আরও পড়ুন

RELATED Articles