‘মহিলা সাংসদের উপর অ’শালীন আচরণও বন্ধ করা যায়নি…সহযোগিতা সহানুভূতিও পাইনি’, মহিলাদের সম্মান নিয়েই বিস্ফো’রক প্রশ্ন কাকলি ঘোষ দস্তিদারের! তবে কি তৃণমূলের অন্দরেই চাপা পড়ে যাচ্ছিল নারী অপমা:নের অভি’যোগ?

ভোটে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে অসন্তোষের সুর ক্রমশ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। সেই আবহেই বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar)। গত ২৪ মে, বারাসাতের জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পাশাপাশি দলের অন্দরমহলের একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আনেন তিনি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, দলের মধ্যে “প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি”, “দুর্বৃত্তায়ন” এবং “অহমিকা” সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্রায় ১৫ বছর ধরে যেসব অভিযোগ বিরোধীরা তুলে আসছিল, এবার সেই বাস্তবতাই যেন দলের ভরাডুবির পর স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে শাসকদল।

তৃণমূলের খারাপ নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে নিজের দায়ও স্বীকার করেছেন কাকলি। তিনি জানিয়েছেন, জেলার সাংগঠনিক প্রধান হিসেবে ব্যর্থতার নৈতিক দায় তাঁরও রয়েছে। তবে সেই সঙ্গে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ভুল নয়, গোটা সাংগঠনিক ব্যবস্থার মধ্যেই এক ধরনের অস্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার তৈরি হয়েছিল। তাঁর কথায়, “দুর্বৃত্তায়ন মধ্যবিত্ত মানুষ নেয় না, অসদাচরণও নেয় না।” একই সঙ্গে নেতাদের জীবনযাত্রার “বৈভব” নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। রাজনৈতিক মহলের মতে, এতদিন দলীয় সীমারেখার মধ্যে থাকা অসন্তোষ এবার প্রকাশ্যে চলে আসায় তৃণমূলের অন্দরেই নতুন করে চাপ বাড়ল।

যদিও কাকলির পদত্যাগ নিয়ে অনেক দিন ধরেই জল্পনা চলছিল রাজনৈতিক মহলে। নির্বাচনে ভরাডুবির পর তাঁকে লোকসভার মুখ্য সচেতকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সোশ্যাল মিডিয়াতেও উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। সেই সময় থেকেই দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছিল। অবশেষে রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী (Subrata Bakshi)-কে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেখানে তিনি নাম না করেই আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, কমবয়সি ও অনভিজ্ঞ কিছু কর্মী দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাদের ধমক দিচ্ছিলেন, কর্মীদের অপমান করছিলেন এবং ভুল পথে পরিচালিত করছিলেন। তাঁর দাবি, “সর্বনাশ করার মূলে যদি কেউ থাকে, তাহলে ওই সংস্থা।”

পদত্যাগপত্রেও একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে ধরেছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তিনি লিখেছেন, “গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব ও দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর” এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তৃণমূল তাঁকে সম্মান ও দায়িত্ব দিলেও, বর্তমানে সেই পরিবেশ আর অবশিষ্ট নেই বলেই দাবি তাঁর। বিশেষ করে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল মহিলা কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন পদে থেকে এক মহিলা সাংসদের উপর অন্য এক দলীয় সাংসদের “অশালীন আচরণ” বন্ধ করা যায়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। আরও বিস্ফোরকভাবে তিনি লেখেন, উর্ধ্বতন নেতৃত্বের কাছ থেকেও কোনও সহযোগিতা বা সহানুভূতি পাননি। ফলে সেই পদে থাকার আর কোনও অর্থ নেই বলেই মনে করছেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ আকস্মাৎ মৃ’ত্যুতে চিরনিদ্রায় জনপ্রিয় পরিচালক অনীক দত্ত! পরিচালকের অকাল মৃ’ত্যুতে শোকে মূহ্যমান টলিউড

শুধু তাই নয়, কাকলি তাঁর চিঠিতে তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দলের মধ্যে অস্বচ্ছতা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বেড়েছে। সৎ ও পুরনো কর্মীদের গুরুত্ব না দিয়ে “ভুঁইফোড় সংস্থা”-র উপর নির্ভর করার ফলেই এই রাজনৈতিক বিপর্যয় এসেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, রাজনীতির বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে তথাকথিত কৌশলগত পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াই দলের বড় ভুল। তাঁর বক্তব্য, “২২ বছরের ছেলেমেয়েরা ৪০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে ধমকাচ্ছে।” রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কাকলির এই বিস্ফোরক পদত্যাগপত্র শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, তৃণমূলের অন্দরে জমে থাকা বড়সড় অসন্তোষেরই প্রকাশ।

আরও অন্যান্য খবর