পূর্ব বর্ধমানের কালনায় হঠাৎই রাজনৈতিক আবহে চড়ছে উত্তাপ। গ্রামাঞ্চলের নিত্যদিনের সমস্যা, উন্নয়নের পরিকল্পনা—সবকিছুকে ছাপিয়ে এখনকার কেন্দ্রবিন্দু একটাই প্রশ্ন—হাটকালনা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান আদৌ এ দেশের বাসিন্দা তো? অভিযোগের ঝড়ে এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। মানুষ ভিড় জমাচ্ছে আড্ডার আসরে, কারণ অভিযোগটা শুধু রাজনৈতিক নয়, পরিচয়ের প্রশ্নেও বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিজেপির তরফে অভিযোগ—তৃণমূলের হাটকালনা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান শ্রাবন্তী মণ্ডল নাকি ২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে বেআইনি উপায়ে ভারতে এসেছেন। এরপর কালনার মুক্তারপুরে স্বামী বনমালী মণ্ডলের সঙ্গে বসতি গড়েন। অভিযোগ আরও গুরুতর—প্রতিবেশী সচিন ব্যাপারীকে নিজের ‘বাবা’ হিসেবে দেখিয়ে ভোটার লিস্টে নাম তোলেন তিনি। এমনকি জন্মের শংসাপত্র থেকে শুরু করে SC সার্টিফিকেট—সব নথিই নাকি ভুয়ো।
অভিযোগ ঘিরে জল ক্রমশ ঘোলা হলেও শ্রাবন্তী মণ্ডল নিজের অবস্থানে অনড়। তাঁর দাবি, “এসব পুরোপুরি মিথ্যে। যারা অভিযোগ এনেছে, তারা প্রমাণ দিক। আমার কাগজপত্র জাল—এটা দেখাতে পারলে আমি নিজেই আইনগত পদক্ষেপ নেব। আমাকে বাবা-মা ছোটবেলায় নিয়ে এসেছে, ২০০০ সালেরও আগে।” অর্থাৎ নিজের ভারতীয় পরিচয় নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। অন্যদিকে, বিজেপির কালনা মণ্ডল সভাপতি গৌর মণ্ডলের বক্তব্য, “যাদের বাবা-মা দেখানো হয়েছে তারা আসল বাবা-মা নন। ভুয়ো কাগজে SC সার্টিফিকেট পর্যন্ত তুলেছে। আমরা প্রমাণ দেব।”
পাল্টা অভিযোগে মাঠে নেমেছে তৃণমূলও। দলের কালনা বিধায়ক দেবপ্রসাদ বাগের বক্তব্য, “শ্রাবন্তী কালনারই মেয়ে। এখানেই স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেছে। তাঁর আসল বাবা-মা এখানেই থাকেন। সরকারি নথিও তার ভিত্তিতেই তৈরি। বৈধ নথি দিয়েই সে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, প্রধানও হয়েছে।” অর্থাৎ তৃণমূলের দাবি—অভিযোগ নিছক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এদিকে পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক দফতরেও নড়াচড়া শুরু হয়েছে। কালনার মহকুমাশাসক ইতিমধ্যেই তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। কোন নথি আসল, কোনটি জাল, আর এই গুরুতর অভিযোগের পেছনে কতটা সত্যতা রয়েছে—সবটাই খতিয়ে দেখা হবে প্রশাসনের তরফে। তবে তদন্ত শুরু হলেও সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—স্থানীয় প্রশাসনের মুখ্য নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়েই যদি নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা কোন পথে এগোবে?
আরও পড়ুনঃ Primary TET Verdict: পরিবারের দিক ভেবে রায়, ‘নথির ওপরই জোর দেওয়া উচিত’ – প্রতিক্রিয়ায় শুভেন্দু
পুরো ঘটনা এখন রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে হাটকালনার পরিবেশ উত্তপ্ত। তদন্তের রিপোর্ট সামনে না আসা পর্যন্ত জল্পনা থামার সম্ভাবনা নেই। তবে আপাতত গ্রামবাসী থেকে রাজনৈতিক মহল—সবাই তাকিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দিকে, কারণ এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তৈরি হতে পারে বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝড়।





