রোজকার ব্যস্ত জীবনে খুব একটা থমকে দাঁড়ায় না শহর। তবে আজকের হাওড়া স্টেশনের দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। যেন হাজারো মানুষের মনে একই উত্তেজনা, একই অপেক্ষা। কেউ কোনও আত্মীয়কে নিতে আসেনি, কেউই নিজের জন্য আসেনি—সবাই এসেছে এক জন মানুষকে এক ঝলক দেখার আশায়। তাঁর ফিরে আসার খবরে রিষড়ার এক অচেনা গলির প্রতিটি ঘরে ঘরে আলো জ্বলেছে। যেন কারও একান্ত আপনজনের ঘরে ফিরছেন।
জন্মদাতা পুত্রের জন্য ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে, স্ত্রী চোখে জল মুছে অপেক্ষায়, আর আট বছরের এক খুদে মুখ উজ্জ্বল করে বলছে, “আজ আমি বাবার সঙ্গে খেলব।” এই দৃশ্যগুলো শুধু আবেগ নয়, বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক অপূর্ব প্রত্যাবর্তনের গল্প। যাঁকে নিয়ে এত ভালোবাসা, তিনি আর কেউ নন—পাকিস্তানে বন্দি হয়ে পড়া বিএসএফ জওয়ান পূর্ণম কুমার সাউ।
শুক্রবার বিকেলে হাওড়া স্টেশনের ১৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছন পূর্ণম। জাতীয় পতাকা হাতে তাঁকে স্বাগত জানাতে হাজির বাবা এবং রিষড়া পুরসভার চেয়ারম্যান-সহ বহু সাধারণ মানুষ। “আপনাদের প্রার্থনার জোরেই আমি ফিরতে পেরেছি,” বলে হাত জোড় করেন তিনি। তখন প্ল্যাটফর্মজুড়ে শুধু করতালি আর ‘ভারত মাতার জয়’-এর ধ্বনি। কেউ কেউ আবেগে গলা ধরে আসা স্বরে বলছিলেন, “আমরা গর্বিত, আপনি আমাদের জন্য লড়েছেন।”
হাওড়া থেকে রিষড়ার পথে যখন পূর্ণমের গাড়ি এগোচ্ছে, রাস্তার ধারে মানুষ দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন, মোবাইলে ভিডিও তুলছেন। বাড়িতে তখন চলছে প্রস্তুতির শেষ মুহূর্তের তোড়জোড়। আলো, কেক, প্রদীপে সাজানো হয়েছে ঘর। রান্নাঘরে চলছে লুচি, মিষ্টি, তরকারি বানানোর ধুম। প্রতিবেশীরা কেউ পায়েস পাঠাচ্ছেন, কেউ ফল। একরকম উৎসবের আমেজেই ভেসে যাচ্ছে সাউ পরিবার।
পূর্ণমের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী জানালেন, “শেষবার মার্চ মাসে এসেছিলেন। এপ্রিলের ২৩ তারিখে ওকে পাকিস্তানে ধরে ফেলে। এর পর থেকে শুধু দিন গোনা চলছিল। দু’মাস পর আবার দেখা হচ্ছে, এই ভাবতেই কান্না আসে। ও লুচি আর মিষ্টি খুব পছন্দ করে, তাই ওর পছন্দ মতো রান্না হচ্ছে। ওর জন্য কেক এনেছি। ও বাড়িতে থাকলে মনটাই অন্যরকম হয়ে যায়।” পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা বলল, “আমি বাবার সঙ্গে আজ ফুটবল খেলব।”
আরও পড়ুনঃ Kolkata High Court : ‘শিক্ষকদের সম্মান রাখতে হবে’, বিকাশ ভবনের সামনে নয়, প্রতিবাদের নতুন রুট দেখাল কলকাতা হাইকোর্টের !
বিকেল পাঁচটা বেজে কুড়ি মিনিট। সাউ পরিবারের সেই পুরনো বাড়ির সামনে একটা গাড়ি দাঁড়াল। দরজা খুলে বেরোলেন পূর্ণম। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ থেকে ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনি উঠল। প্রতিবেশীরা ফুল ছড়ালেন, কেউ কেউ আবেগে কেঁদে ফেললেন। স্ত্রীর চোখে জল, পূর্ণমের মুখে শান্ত এক হাসি। কোল জুড়ে ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে পা রাখলেন তিনি। মনে হল, বাস্তবেই যেন রাম অযোধ্যায় ফিরছেন।





