সল্টলেকের ব্যস্ত তথ্যপ্রযুক্তি এলাকার কাচঘেরা দালানগুলির ভিড়ে প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ তরুণী কাজের খোঁজে ছুটে আসেন। তাদেরই একজন ছিলেন সুচরিতা ভট্টাচার্য। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়েও নিজের মেধা আর পরিশ্রমে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়েছিলেন কর্মজীবনে। প্রথমে সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করলেও পরে কল সেন্টারের দলনেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। অফিসের কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর মনে লুকিয়ে ছিল অন্য এক স্বপ্ন। ছোটবেলা থেকেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাচের অনুশীলন করা কিংবা প্রিয় গানের সুর গেয়ে ওঠা ছিল তাঁর নিত্য অভ্যাস। মঞ্চে যাত্রা ও নাটকে অভিনয় করার সময় মনে মনে তিনি ভাবতেন কোনও একদিন হয়তো বড় পর্দাতেও নিজেকে দেখতে পাবেন।
সেক্টর ফাইভের কর্মব্যস্ত সকাল ছিল তাঁর জীবনের নিয়মিত ছবি। বাস বা অটো থেকে নেমে আইডেন্টিটি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে দ্রুত পায়ে অফিসের দিকে হাঁটা ছিল প্রতিদিনের রুটিন। চারপাশে তখন হাজারো কর্মীর ভিড়, প্রত্যেকের চোখে আলাদা আলাদা স্বপ্ন। সুচরিতাও সেই স্বপ্নের ভিড়েই নিজের জায়গা খুঁজছিলেন। কাজের পাশাপাশি অভিনয়ের প্রতি টান কখনওই কমেনি তাঁর। যাত্রা বা থিয়েটারের ছোট ছোট মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে করতে মনে হতো এই পথই হয়তো একদিন তাঁকে বড় সুযোগের দিকে নিয়ে যাবে। সেই বিশ্বাসই তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছিল।
জীবনের পথচলায় অন্য অনেকের মতোই প্রেমও এসেছিল তাঁর জীবনে। ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু সুখের সেই অধ্যায় খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই সম্পর্কের ভাঙন দেখা দেয় এবং সেই সংসার টিকিয়ে রাখা আর সম্ভব হয়নি। ভাঙা সম্পর্কের কষ্ট বুকে নিয়ে তিনি ফিরে আসেন বাপের বাড়িতে। তখন মনে হয়েছিল সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে এবং নতুন করে আবার নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারবেন।
ঠিক সেই সময়ই পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল করোনা মহামারী। কর্মসংস্থান কমে গেল, অনিশ্চয়তায় ভরে উঠল অসংখ্য মানুষের জীবন। সুচরিতার জীবনেও সেই সময় নেমে এল কঠিন বাস্তবতা। সংসারের দায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে গিয়ে তাঁকে এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে হয় যা আগে কখনও ভাবেননি। জীবনের প্রয়োজনে তিনি এমন এক পেশার দিকে এগিয়ে গেলেন যা সমাজের চোখে বিতর্কিত এবং সাধারণত আড়ালেই থেকে যায়।
আরও পড়ুনঃ “বিধানচন্দ্র রায়ের পর এতদিন সফলভাবে রাজ্য চালিয়েছেন মমতাই!” ধর্মতলার মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ কবীর সুমন! বাংলায় ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে আর কী বললেন তিনি?
ধীরে ধীরে তিনি পৌঁছে গেলেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে যেখানে আলো ঝলমলে বাস্তবের আড়ালে থাকে অন্ধকারের আরেক বাস্তবতা। মোবাইলের পর্দা আর ভার্চুয়াল দুনিয়ার মধ্যে গড়ে ওঠা সেই জগতে তিনি হয়ে উঠলেন বহু মানুষের কল্পনার অংশ। সংসারের দায়িত্ব সামলানোর জন্য এই পথ বেছে নিলেও তাঁর ভিতরে লুকিয়ে ছিল এক লড়াকু মধ্যবিত্ত মেয়ের বাঁচার সংগ্রাম। সমাজের চোখে বিতর্ক থাকলেও নিজের জীবনের কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার গল্পই যেন নতুন করে লিখলেন সুচরিতা।





