বেঙ্গালুরুর একটি কলেজে কমন এন্ট্রান্স টেস্ট (CET) পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে পাঁচ জন ব্রাহ্মণ ছাত্রকে তাঁদের পৈতে বা উপবীত খুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়। ঘটনাটি পরীক্ষার প্রথম দিনেই ঘটে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি সামনে আসতেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ওঠে এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর চর্চা। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কলেজের তিন অধ্যাপককে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং রাজ্য সরকার পুরো বিষয়টির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
পরীক্ষার্থীদের দাবি, পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সময় নিরাপত্তার কারণে ধাতব জিনিস খুলে রাখতে বলা হয়েছিল, যা তাঁরা মেনেও নেন। কিন্তু এরপর যখন উপবীত খুলতে বলা হয়, তখন অনেকেই বিস্মিত হন। এক ছাত্র সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে জানিয়েছেন, কানের দুল খুলে দেওয়ার পর তাঁকে পবিত্র উপবীতও খুলতে বাধ্য করা হয়। পরীক্ষায় বসার তাগিদে তিনি পরিস্থিতির চাপে সেই নির্দেশ মেনে নেন, কিন্তু পরে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আইনি অভিযোগ দায়ের করেন। শুধু পৈতে নয়, কয়েকজন ছাত্রের অভিযোগ, তাঁদের হাতে বাঁধা ধর্মীয় সুতোও খুলে ফেলতে বলা হয়েছিল।
অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের সঙ্গে যুক্ত ধারায় একটি এফআইআর দায়ের করেছে। অভিভাবকদের বক্তব্য, পরীক্ষা পরিচালনার নিয়মে কোথাও পৈতে খোলার নির্দেশ ছিল না। তাঁদের দাবি, ধর্মীয় প্রতীক বা বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত বিষয়কে এভাবে বাধা দেওয়া ঠিক নয়। গত বছরও একই ধরনের একটি বিতর্কের পর কর্ণাটক সরকার স্পষ্ট করেছিল যে, পরীক্ষার সময় যজ্ঞোপবীত খুলে রাখা বাধ্যতামূলক নয়। ফলে এবার একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে, আগের নির্দেশিকা ঠিকভাবে মানা হল কি না।
ঘটনাটি নিয়ে কর্ণাটকের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এম সি সুধাকর একে “দুঃখজনক” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে এবং বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর কথায়, দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে এই ধরনের বিভ্রান্তি এড়াতে স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করা হবে, যাতে পরীক্ষা পরিচালনার সময় কোন জিনিসে নিষেধাজ্ঞা থাকবে আর কোন ক্ষেত্রে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো হবে, তা পরিষ্কার থাকে।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বিরোধী দল বিজেপি এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে কর্ণাটকের কংগ্রেস সরকারকে আক্রমণ করেছে। বিরোধী দলনেতা আর অশোক দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে একাধিক বিতর্ক সামনে এসেছে, যা মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন সংবেদনশীল ঘটনাকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার বদলে প্রশাসনিক ও আইনি দিক থেকে নিরপেক্ষ তদন্তই সবচেয়ে জরুরি। কারণ ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং পরীক্ষার নিরাপত্তা, দুটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ চাল ব্যবসার আড়ালে কালো টাকা সাদা করার চক্র? রেশন দুর্নীতি মামলায় হাবড়া-সহ মোট ১৭টি জায়গায় একযোগে ইডির বড় অভিযান, দ্বিতীয় দফার ভোটের আগেই চাঞ্চল্য রাজ্যজুড়ে!
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পরিচয় বা প্রতীককে কেন্দ্র করে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিছুদিন আগেই লেন্সকার্টকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্ক থামেনি, তার আগে টিসিএস-সংক্রান্ত ঘটনাও মানুষের নজরে এসেছিল। সেই আবহেই বেঙ্গালুরুর এই নতুন ঘটনা আবারও জনমনে প্রশ্ন তুলেছে, নিরাপত্তা বিধির নামে কোথায় সীমারেখা টানা উচিত? সাধারণ মানুষের একাংশের দাবি, যে কোনও ধর্মীয় প্রতীকের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আর তৈরি না হয়। এখন সবার নজর সরকারের তদন্ত রিপোর্ট এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।





