তিনি কি শুধুই সাম্প্রদায়িক? বঙ্গ বিভাজনই কি তাঁর একমাত্র পরিচয়? বিতর্ক আজও পিছু ছাড়েনি ভারতকেশরীর…

আজ ১১৯ তম জন্মবার্ষিকী ‘বাংলার বাঘ’ আশুতোষ মুখার্জীর সুপুত্র ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর (Shyama Prasad Mukherjee)। কথিত আছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যর আশুতোষের ছেলে হওয়ায় শ্যামাপ্রসাদের উপরে নজর ছিল অনেকেরই। বিশেষত, তিনি ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন বলে। বিশাল বড় ব্যক্তিত্বের ছেলে হওয়ার বিপদও অনেক রয়েছে। স্নাতক স্তরে ইংরাজিতে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। কিন্তু আশুতোষ মুখার্জী নিজের মাতৃভাষার উপরে গুরুত্ব আরোপ করায়, তিনি স্নাতকোত্তর স্তরে বাংলা নিতে বাধ্য হন। আইনেও সমান পারদর্শিতা ছিল শ্যামাপ্রসাদের। আর যার ফলে শ্যামাপ্রসাদের ক্লাসে অন্য কোনও মেধাবী ছাত্র পড়তে চাইত না। কারণ তাঁরা সকলেই জানত, যে সেরা শ্যামাই হবে।

শ্যামাপ্রসাদের জীবনের উপর ভিত্তি করে লেখা লোকসভা সেক্রেটারিয়টের ‘এমিনেন্ট পার্লামেন্টারিয়নস’-এর পৃষ্ঠা চারে লেখা হয়েছে, ‘‘ছাত্র বয়স থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে বাবাকে সমান তালে সাহায্য করতেন শ্যামাপ্রসাদ। ১৯২৩ সালে আশুতোষের মৃত্যু হয়। অগত্যা শিক্ষাক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদকে সেই আসতেই হয়, যদিও তখনও তিনি ছাত্র।’’

তাঁর বাবা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে ছিলেন, তখন শ্যামাপ্রসাদের সঠিক ভূমিকা কী ছিল তা বলা মুশকিল। তবে বাবার মৃত্যুর পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সংস্থা, সেনেটে নির্বাচিত হন তিনি। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২। পড়াশোনা শেষ‌ও হয়নি। ১৯২২ সালে ২১ বছর বয়সে সুধাদেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর যখন ৩৩ বছর বয়স, তখন তাঁর স্ত্রী’র আকস্মিক মৃত্যু হয়। এরপর পুনরায় আর তিনি কখনও কোন‌ও বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াননি।

স্ত্রী’র বিয়োগের বছরেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে কমবয়সী উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হন শ্যামাপ্রসাদ। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮, চার বছরের মেয়াদে তাঁর উদ্যোগে অনেক নতুন শাখায় পড়াশোনা শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। যার মধ্যে ছিল মহিলাদের জন্য বিশেষ পাঠক্রম এবং গৃহবিদ্যার পঠনপাঠন। কৃষিবিদ্যা নিয়ে লেখাপড়ার শুরুও তাঁর হাতে। স্কুলশিক্ষকদের প্রশিক্ষণের উপরেও তিনি বিশেষ জোর দেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চৈনিক ও তিব্বতীয় ভাষার চর্চাও শুরু হয় তাঁর‌ই উদ্যোগে। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান, আশি বছরের ইংরাজির একাধিপত্য ভেঙে বাংলা মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া। রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশিষ্ট প্রফেসর’ হিসেবে নিয়োগ করার কৃতিত্বও তাঁর। ১৯৩৭ সালে প্রথম বাংলা ভাষায় সমাবর্তনী ভাষণ দিয়েছিলেন কবিগুরু। হিন্দি এবং উর্দু ভাষার শিক্ষাকেও প্রাধান্য দিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। স্নাতক স্তরে অহমিয়া ভাষা চালু করেছিলেন। কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, জনস্বাস্থ্য, পরীক্ষামূলক মনস্তত্ত্ববিদ্যা, অঙ্ক এবং এরোনটিক্স শাখায় পঠনপাঠনের শুরুও তাঁরই হাতে। ১৯৩৮ সালের ৮ই অগস্ট উপাচার্য হিসেবে তাঁর মেয়াদ ফুরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে সাম্মানিক ডি.লিট ডিগ্রি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সেনেট। আপত্তি তুলেছিলেন অনেকেই।

রাজনীতির অঙ্গনে শ্যামাপ্রসাদ:

ক‌ংগ্রেসের টিকিটেই ১৯২৯ সালে বঙ্গে বিধানসভায় পা রাখেন আশুতোষ পুত্র। কিন্তু ১৯৩০ সালে কংগ্রেসের বাকি সদস্যরা প্রতিবাদ জানানোয় তিনি পদত্যাগ করেন। তখন নির্দল প্রার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে পুননির্বাচিত হন শ্যামাপ্রসাদ। ১৯৩৭ সালে প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনে লড়াই করেন তিনি। ১৯৩৫-এর গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার (ভারত সরকারের) আইন অনুযায়ী, সেই নির্বাচন হয়েছিল এবং তাতে জয় লাভ করেন শ্যামাপ্রসাদ।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে উত্থান হলেও, বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের সরকার গড়তে রাজি হয়নি কংগ্রেস। যদিও এ কে ফজলুল হকের ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ সেই সরকারে থাকতে রাজি হয়েছিল। ক্রমশ মুসলিম লিগের কাছাকাছি চলে আসেন ফজলুল। লিগের সাহায্যে জোট সরকার গড়েন তিনি। ১৯৩৯ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল, সুভাষচন্দ্র বসুর কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ।

তবে এই বড় ঘটনার আড়ালে যা অনেকের নজির এড়িয়ে গিয়েছিল, তা হল সাভারকরের হিন্দু মহাসভায় শ্যামাপ্রসাদের যোগদান। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ঠিক তার পরের বছর কার্যনির্বাহী সভাপতি করা হয় তাঁকে। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয়োজিত এক হিন্দু সমাবেশে মুসলিমদের উদ্দেশে শ্যামাপ্রসাদ বলেছিলেন, ‘‘যদি পাকিস্তানে থাকতে চাও, তবে ব্যাগ-পত্তর গুছিয়ে এক্ষুনি ভারত ছাড়ো…’’

১৯৪১ সালে ফজলুলের সরকারের উপর থেকে মুসলিম লিগ নিজেদের সমর্থন প্রত্যাহার করে। কারণ, জিন্নার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ভাইসরয়ের যুদ্ধকালীন প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সঙ্গে হাত মেলান ফজলুল। এমন সময়ে ময়দানে নামেন শ্যামাপ্রসাদ। বিভাজন প্রসঙ্গে হকের অবস্থান জানতেন শ্যামাপ্রসাদ। তবুও ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে বাংলায় দ্বিতীয় জোট সরকার গঠনে ফজলুলকে সাহায্য করেন। ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর ফজলুল হকের সরকারে অর্থমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন শ্যামাপ্রসাদ। ১৯৪২-এর ২০ নভেম্বর পর্যন্ত ওই পদে আসীন ছিলেন তিনি।

১৯৪২ সালের মার্চে ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতার পরে ১৪ই জুলাই মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধায় ইংরেজদের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি চেয়ে কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়। ইংরেজরা তা মানতে রাজি না হলে, আইন অমান্য আন্দোলনের পথে নামে কংগ্রেস। আইন অমান্য এবং এর পরে ভারত ছাড়ো আন্দোলন, দুটিরই কঠোর বিরোধিতা করেন শ্যামাপ্রসাদ। ১৯৪২ সালের ২৬ জুলাই বাংলার গভর্নর জন হার্বার্টকে তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘যুদ্ধ চলার সময়ে যদি কেউ জনতার আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটায়, সরকার যেন তার প্রতিরোধ করে।” ব্রিটিশ গভর্নরকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আপনাদের একজন মন্ত্রী হিসেবে, আমি পূর্ণ সহযোগিতা জানাচ্ছি।’’

প্রসঙ্গত, শ্যামাপ্রসাদ-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন যাতে ব্যর্থ হয়, ইংরেজ সরকারের কাছে তার জন্য দরবারও নাকি করেছিলেন তিনি। মন্ত্রীরা কী প্রচার করবেন, তা-ও চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন গভর্নরকে… ‘‘যে স্বাধীনতার জন্য কংগ্রেসের এই আন্দোলন, তা ইতিমধ্যেই জনপ্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশের উপরে যেন ভারতীয়দের আস্থা থাকে…’’ তবে নির্বাচিত সরকারের প্রতি গভর্নর হার্বার্টের ঔদ্ধত্যমূলক আচরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। কাজ করার সুযোগ না দেওয়ায় আমলাতন্ত্রের উপরেও বিরক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর সরকারবিরোধী বক্তব্য ব্রিটিশরা রুখে দেওয়ায় বেশ ক্ষুব্ধও হয়েছিলেন। ওই একই সময়ে মেদিনীপুরের বন্যা-কবলিত জায়গা পরিদর্শন করতে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। ওই সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। মাসকয়েক আগে যে ব্রিটিশ সরকারের প্রশংসা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ, তারই কড়া সমালোচনা করে ১৯৪২ সালে পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। এই ঘটনাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে মান্যতা দিয়ে অনেকেই শ্যামাপ্রসাদকে বলেন, ‘ইংরেজবিরোধী জাতীয়তাবাদী’।

১৯৪৩ সালে বাংলায় ফজলুল হক ক্ষমতাচ্যুত হন। তার পরে খাজা নাজিমুদ্দিন রক্ষণশীল মুসলিম লিগ সরকার গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া ক্রমশ ঘনীভূত হতে শুরু করেছিল তখন। তার পাশাপাশি বাংলায় দুর্ভিক্ষের হাহাকার। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলেন নাজিমুদ্দিন। হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনমনও রুখতে পারেননি তিনি। এর পরে পরবর্তী প্রাদেশিক নির্বাচন স্থগিত করে দেন ব্রিটিশরা। এ দিকে নতুন নেতা হুসেন শাহিদ সোহরাওয়ার্দির নেতৃত্বে ব্রিটিশ মদতপুষ্ট মুসলিম লিগ আরও শক্তিশালী হতে থাকে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম সংরক্ষিত নির্বাচনী কেন্দ্রগুলি দখল করেছিল মুসলিম লিগ। ‘সাধারণ’ বা অ-সংরক্ষিত আসনগুলি দখল করেছিল কংগ্রেস। কিন্তু হিন্দু মহাসভা নিশ্চিত ভাবে হেরে যায়।

জিন্না, সোহরাওয়ার্দি, হকের মতো বিশিষ্ট মুসলিম নেতা-সহ প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা শরৎ বসুর‌ও মত ছিল ভারতবর্ষ থেকে গোটা বাংলা প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার। তাঁদের দাবি ছিল, হিন্দু অধ্যুষিত কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী শিল্পোন্নত এলাকা যদি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামীণ এলাকার সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়, তবে স্বাধীন বাংলা কৃষিনির্ভর হয়েও পিছিয়ে পড়বে। ওই সময়ে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার দ্বিতীয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন, ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সভার জাতীয় সভাপতি ছিলেন তিনি।

১৯৪৭ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি তারকেশ্বরে একটি বড় সভার আয়োজন করা হয়। প্রস্তাবিত মুসলিম অধ্যুষিত বাংলা প্রদেশে হিন্দুপ্রধান এলাকাগুলি যাতে যোগ না করা হয়, তার জন্য শ্যামাপ্রসাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের মে মাসে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে চিঠি লিখে বাংলা বিভাজনের প্রস্তাব দেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। শরৎ বসু এবং সোহরাওয়ার্দির প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন তিনি। ভারতবর্ষকে দ্বিধাবিভক্ত করার জন্য স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে গণভোটের প্রস্তাবে একমত হন কংগ্রেসের নেতারা, মুসলিম লিগ এব‌ং বলদেব সিংহের প্রতিনিধিত্বে শিখরা। তিনটি পর্যায়ে ভোটদানের পরে অবশেষে ২০শে জুন বাংলাকে হিন্দু এবং মুসলিমপ্রধান এই দুই ভাগে ভাগ করার চূড়ান্ত প্রস্তাব নেওয়া হয়।

১৯৪৭ সালের অগস্টে স্বাধীন ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় সরকারে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে আসেন খোদ জওহরলাল নেহরু। তবে ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি মহাত্মা গাঁধীর হত্যার পর বদলে যায় পুরো ছবিটা।

পরপরই ২৭শে ফেব্রুয়ারি হিন্দু মহাসভা এবং আরএসএসকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই পটেল। নিজের আশঙ্কা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উনি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘সাভারকরের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভার উগ্রপন্থীরাই এই ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়িত করেছে।’ এ সময়ে শ্যামাপ্রসাদকে পাঠানো বল্লভভাইয়ের চিঠিতে তাঁর বিরক্তির স্পষ্ট প্রকাশ পাওয়া যায়। প্রথমে ১২ই জুন, পরে ১০ই সেপ্টেম্বর গাঁধীর হত্যায় অভিযুক্তদের সমর্থন করার জন্য হিন্দু মহাসভার ‘সাবস্ক্রিপশন ড্রাইভ’ থেকে বঞ্চিত করা হয় শ্যামাপ্রসাদকে। মহাসভা এবং আরএসএসকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে যুক্তিও দেন বল্লভভাই।

রক্ষণশীল হিন্দু হিসেবে, নেহরুর সংস্কারের কঠোর সমালোচক ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। নেহরুর হিন্দু আইনের কিছু সংস্কার নিয়ে খুব আপত্তি ছিল তাঁর। এ ছাড়া বিবাহবিচ্ছেদ এব‌ং এক-বিবাহ নীতিরও বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। হিন্দু এবং উদ্বাস্তুদের স্বার্থরক্ষাও করেছিলেন তিনি।

এরই মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরে নেহরু-লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৫০ সালে ক্যাবিনেট থেকে ইস্তফা দেন শ্যামাপ্রসাদ। জম্মু-কাশ্মীরের ৩৭০ নং ধারা নিয়ে প্রতিবাদ করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি দক্ষিণপন্থী প্রজা পরিষদ গঠন করে “এক প্রজাতন্ত্রের মধ্যে আরেকটা প্রজাতন্ত্র থাকতে পারে না” এই দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এই কারণে জম্মু-কাশ্মীরে ১৯৫৩ সালের ১১ই মে শ্যামাপ্রসাদকে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দি করা হয়। জেলে বন্দী অবস্থাতেই মৃত্যু হয় বহু আলোচিত এবং বিতর্কিত এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের। যদিও তার মৃত্যুকে স্বাভাবিক হৃদরোগের মৃত্যু বলে উল্লেখ করা হয়েছে সব জায়গায় তবুও তাঁর মৃত্যু নিয়ে পরবর্তীকালে উঠেছে অনেক প্রশ্ন। জম্মু কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রবর্তনের বরাবরই বিরোধী ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। একই দেশের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের অন্য একটি পতাকা এবং ভিন্ন একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন একথা কখনই মেনে নিতে পারেননি আশুতোষ পুত্র।

তাই তিনি ১৯৫৩ সালে ঠিক করেন যে কোনও রকম অনুমতি ছাড়াই তিনি জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করবেন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই সফরে ছিলেন একজন সাংবাদিক হিসাবে। বস্তুত সবাই ভেবেছিল তিনি জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করা মাত্রই তাকে আটক করে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো। একথা বলা হয় যে জওহরলাল নেহেরু এবং জম্মু-কাশ্মীর সরকার একসঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ঠিক করে যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে জম্মু-কাশ্মীরে ঢুকতে দেওয়া হবে ঠিকই কিন্তু তাঁকে আর ফেরত পাঠানো হবে না। তাই তিনি জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করতে পারেন ঠিকই কিন্তু প্রবেশ করার পরেই তাকে জেল বন্দি করে ফেলা হয়। পরে জানিয়ে দেওয়া হয় যে জেলের মধ্যেই তার হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে।

এই ঘটনা সেইসময় অনেক প্রশ্ন তোলে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মা যোগমায়া দেবী নিজে জহরলাল নেহেরুকে অনুরোধ করেন যে ব্যাপারটি তদন্ত করতে কিন্তু জানা যায় যে জহরলাল নেহেরু উত্তর দিয়েছিলেন যে ওই সময় যারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন তারা বলেছেন যে কোনওরকম অস্বাভাবিক কিছু হয়নি। তাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কীভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তার সঠিক কারণ এখনও মানুষের অজানা। তাঁকে সবাই মুসলিম বিরোধী বলে মনে করলেও তিনি কিন্তু বাংলার কবি কাজী নজরুল ইসলামকে চিকিৎসা পেতে সাহায্য করেছিলেন। ঐতিহাসিকবিদরা এখনও মনে করেন যে, তাঁর সঠিক মূল্যায়ন এখনও পর্যন্ত বাঙালিরা করে উঠতে পারেনি।

আরও অন্যান্য খবর