তিন সপ্তাহ উৎকণ্ঠায় ছিল সারাদেশ। সোমবার বিকালে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের (Pranab Mukherjee)। ভারত হারালো আর এক রত্নকে। বাঙালি ও হারাল তার হাতে গোনা আইকনদের একজনকে। এমন পরিপূর্ণ ও সফল জীবন খুব কমই দেখা যায়। বয়স হয়েছিল ৮৪।
প্রণব মুখোপাধ্যায় (Pranab Mukherjee) তার দীর্ঘ পাঁচ দশকের বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে ইন্দিরা গান্ধী থেকে সোনিয়া গান্ধী, কংগ্রেস নেতৃত্বের পুরোভাগে স্বমহিমায় বিরাজ করেছেন। তবেই এর মধ্যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের (Manmohan Singh) সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল সবথেকে ব্যতিক্রমী।
মনমোহন সিং (Manmohan Singh) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে রাজধানীর ক্ষমতার অলিন্দ্যে মুখরোচক চর্চা চলত। বিষয়টা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও বঙ্গসন্তানকে সম্বোধন করতেন মনমোহন সিং (Manmohan Singh) ‘স্যার’ বলে। কিন্তু কেন? আসলে মনমোহন সিংয়ের এই ডাক তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এর অধীনে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার ফলে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ‘স্যার’ হিসেবে সম্বোধন করায় প্রণব মুখোপাধ্যায় (Pranab Mukherjee) পড়েন চূড়ান্ত অস্বস্তিতে। শেষ পর্যন্ত তাকে স্বস্তিতেই মনমোহন সিং (Manmohan Singh) তার ডাক পাল্টান প্রণব জি হিসাবে অপরদিকে কির্ণাহারের একরোখা ব্রাহ্মণ তাকে চিরকালই ‘ডক্টর সিং’ বলেই ডেকেছেন।
প্রণববাবু প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের (Manmohan Singh) অধীনে কঠিন পরিশ্রম করলেও; ইউপিএ মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যের মতোই সনিয়া গান্ধীর প্রতি বরাবর ঝুঁকেছিল তাঁর আনুগত্যের পাল্লা। মন্ত্রিসভায় অমিত শক্তির অধিকারী প্রণব মুখোপাধ্যায় (Pranab Mukherjee) সপ্রতিভ নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রতিরক্ষা অর্থ এবং বিদেশমন্ত্রকের। ইউপিএ সরকারের যাবতীয় নীতি নির্ধারণ ও সমস্যা সমাধানে সিদ্ধহস্ত ‘গ্রুপ অফ মিনিস্টার্স’ এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসাবে দুর্নীতি দমন থেকে ২০০৮ সালের অর্থনীতি চাঙ্গা করার প্যাকেজ, সব বিষয়েই অগ্রণী ভূমিকা ছিল প্রণব মুখোপাধ্যায়ের (Pranab Mukherjee)।
২০১১ সালে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ভারত বনাম পাকিস্তান ক্রিকেট টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দেখতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন হালিশহরের মনমোহন সিং এই বিষয়ে মন্ত্রিসভার সদস্য প্রণব বাবুর কাছে পরামর্শ চান। কিন্তু প্রণববাবু (Pranab Mukherjee) তাঁকে সরাসরি বলেন, “গুরুতর দ্বিপাক্ষিক বিষয় ছাড়া যে কোন বিষয়ে তিনি কথা বলতে পারেন।”
এরই সাথে, তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী সুখ্যাতি করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের (Manmohan Singh), কারণ ক্রিকেটের নতুন জনপ্রিয় ফরম্যাট সম্পর্কে ধারণা ছিলনা বলেই সারাদিন স্টেডিয়ামে বসে ধৈর্য্য ধরে ক্রিকেট দেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পরে মনমোহন সিংয়ের প্রধান সচিব টিকেএ নায়ার জনান্তিকে জানিয়েছিলেন, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের (Pranab Mukherjee) মস্তিষ্ক কাজ করেছিল, ২০১২ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে বিতর্কিত আত্মসমীক্ষা মূলক করপ্রদান নীতি চালু করার পিছনে। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং প্রণববাবুর মতো অভিজ্ঞ, বিরাট মাপের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পরামর্শ উড়িয়ে দিতে পারেননি বলেই সেই বিষয়ে সায় দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, একাধিক বিষয়ে কিন্তু মনমোহন সিংয়ের সাথে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মন্বন্তরও ঘটেছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রণব (Pranab Mukherjee) ঘনিষ্ঠ কূটনীতিকদের দাপট নিয়ম মাঝে মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত অল্পবিস্তর ঘটতে দেখা গেছে। তা সত্ত্বেও বিবিধ অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক বিষয় নিয়ে নির্দ্বিধায় অগ্রজ রাজনীতিকের পরামর্শ নিতে মনমোহন সিং (Manmohan Singh) কখনও কুণ্ঠাবোধ করেননি।
প্রতিবেদনটি লিখেছেন – অন্তরা ঘোষ






