গত সাত বছর ধরে দিন গুনছিল পরিবার, দেশের মেয়ের প্রতি নির্মমতার দৃশ্যে কেঁপে গেছিল সবাই। অবশেষে, অপরাধের বিচার সম্পূর্ণ হলো। দিল্লির তিহাড় জেলে আজ সকালেই ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেওয়া হল দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের চার প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীকে, মুকেশ সিংহ, বিনয় শর্মা, পবন গুপ্ত এবং অক্ষয় কুমার সিংহকে।
প্রকৃতপক্ষে এই মামলার তদন্তে মোট ৬ জন দোষী সাব্যস্ত হয়। এরমধ্যে একজন বিচারাধীন রাম সিংহ ১১ই মার্চ ২০১৩ সালে তিহাড় জেলেই আত্মহত্যা করে। ওপর এক অপরাধী নাবালক হওয়ায়, তিন বছর হোমে শাস্তির মেয়াদ শেষ করে, ২০১৫ সালে মুক্তি পায়।যদিও নির্ভয়ায় উপর সেই রাতে যে সবচেয়ে নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল সে এই নাবালক।
২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রাতে, দিল্লির রাস্তায় চলন্ত বাসের মধ্যে নির্মম গণধর্ষণ এবং ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন ২৩ বছরের এক প্যারামেডিক্যালের ছাত্রী। ধর্ষণে বাধা দিতে গিয়ে শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হয় তাঁর পুরুষ সঙ্গীকেও।ঘটনার পৈশাচিকতায় শিউরে উঠেছিল গোটা দেশ। পরে তরুণীর আসল নাম পরে প্রকাশ্যে এলেও, নির্ভয়া নামেই তিনি ততদিনে দেশের মেয়ে হয়ে উঠেছিলেন। এরপর তাঁর শরীরে বারংবার অস্ত্রপ্ৰচার করে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্মম অত্যাচারের ১৩ দিন পর, ২৯ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই, দিল্লি পুলিশ একের পর এক গ্রেপ্তার করে বাস চালক রাম সিংহ, মুকেশ সিংহ (রাম সিংহের ভাই), বিনয় শর্মা, পবন গুপ্ত, অক্ষয় সিংহ এবং এক নাবালক। এরপর শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ, আর সেখানেই অপরাধের কথা কবুল করেছিল ৬ জনই।
নির্ভয়ার ধর্ষণ ও খুন দেশের মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে যায়। তারপর চলতে থাকে অনেক বিক্ষোভ, মিছিল, জমায়েত যা একপ্রকার চাপ তৈরি করা সরকারের উপর। সেই মুহূর্তে বিচারের গতিকে ত্বরান্বিত করতে কোর্টের ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি দিল্লির সাকেত আদালতে, ধর্ষণ মামলার জন্য দেশের প্রথম ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট চালু হয়। উদ্বোধন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আলতামাস কবির। পরদিনই সেখানে নির্ভয়া মামলার চার্জশিট পেশ করে দিল্লি পুলিশ।নির্ভয়াকে ধর্ষণ, খুন, অপহরণ, প্রমাণ লোপাট-সহ বিভিন্ন ধারায় এবং নির্ভয়ার বন্ধুকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে চার্জ আনে আদালত।
২০১৩ সালেই, ১০ সেপ্টেম্বর ধৃত ছ’জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের বিচারক যোগেশ খান্না। তার আগেই, এক অপরাধী আত্মহননের পথ বেচে নেয় এবং আর একজন নাবালক হওয়ার সুবাদে আগস্ট মাসে জুভেনাইল কোর্ট তিন বছরের সাজা দেয়। ১৩ সেপ্টেম্বর বাকি চার সাবালক অপরাধীকে ফাঁসিতে ঝোলানোর নির্দেশ দেন ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের বিচারক।আসামী পক্ষের আইনজীবীদের আর্জি খারিজ করে বিচারক খান্না বলেন, এই ঘটনা ‘‘সকল ভারতবাসীর অন্তরে এক গভীর ধাক্কা দিয়েছে এই ঘটনা। তাই আদালত অন্ধ হয়ে বসে থাকতে পারবে না।’’
এরপর নিজেদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে পড়েন চার প্রাপ্তবয়স্ক ধর্ষক-খুনী। নিম্ন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টে সাজা কমানোর আর্জি জানায় তারা।২০১৪ সালের ১৩ মার্চ উচ্চ আদালতও অপরাধীদের আর্জি খারিজ করে মৄত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রাখে। হাইকোর্ট জানায়, যে ধরনের অপরাধ করেছে দোষীরা, তা ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ শ্রেণিতে পড়ে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত আর কিছু সম্ভব নয়।
এর পর, দোষীদের মধ্যে তিন জন— মুকেশ সিংহ, বিনয় শর্মা ও পবন গুপ্ত— ফাঁসির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করার আর্জি জানায় সুপ্রিম কোর্টে। কিন্তু সেখানেও ২০১৮ সালের ৯ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ সেই আর্জি খারিজ করে দেয়।
এর পর বিনয় শর্মার হয়ে তাঁর আইনজীবী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার আর্জি জানান। কিন্তু বিনয় বলেছিল, তার অজান্তেই প্রাণভিক্ষার আর্জি জানানো হয়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানান বিনয় তার প্রাণ ভিক্ষার আর্জি নিজেই সরিয়ে নিয়েছিল।
অন্য দিকে অক্ষয় কুমার সিংহ গত ১০ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টে আলাদা আপিল করে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করার আর্জি জানায়। কিন্তু তাতেও কোনোরূপ লাভ হয়নি তার।১৮ ডিসেম্বর সে আর্জিও খারিজ হয় শীর্ষ আদালত।
এ বছর ৭ জানুয়ারি দিল্লির পাতিয়ালা হাউজ কোর্ট রায় দেয়, ২২ জানুয়ারি সকাল ৭টায় ফাঁসি দেওয়া হবে চার জনকে।এর পর আবার ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়ার পালা শুরু করে বিনয় এবং মুকেশ। সে সব আবেদন একে একে খারিজ হয়ে যায়।
এরমধ্যে বিনয় দাবি করে, ঘটনার সময় সে নাবালক ছিল। কিন্তু তাতেও সাজার বিন্দুমাত্র হের ফের হয়নি। এর পর দিল্লির পাটিয়ালা হাউজ কোর্ট , চার জনের ফাঁসির তারিখ ১ ফেব্রুয়ারি ধার্য্য করে।
কিন্তু এর পরেও আইনি কৌশল থামায়নি অপরাধীরা। একের পর এক তারিখ পিছতে শুরু করে। প্রথমে ৩রা মার্চ নির্দিষ্ট হয় কিন্তু রায় সংশোধনের জন্য পবন আর্জি জানালে ২ মার্চ তা খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট। ওই দিনই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আর্জিও করে পবন। এর জেরে ফের আটকে যায় ফাঁসি। রাষ্ট্রপতি পবনের প্রাণ ভিক্ষার আর্জি খারিজ করে দেওয়ার পর, চতুর্থ বারের জন্য মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে আদালত। দিল্লির পাটিয়ালা কোর্ট জানিয়ে দেয়, ২০ মার্চ ফাঁসি দেওয়া হবে চার জনকে।
এর পরও ফাঁসি রদ বা পিছনোর চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন অপরাধীদের আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের পর আবেদন করা হয় আন্তর্জাতিক আদালতেও। কিন্তু এ বার আর কোনও আইনি কৌশলই কাজে লাগেনি…
এবং অবশেষে দীর্ঘ সাত বছরের লড়াই এর পর এ দিন ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেওয়া হল চার জীবিত সাবালক অপরাধীকে। দেশের মেয়ের বিচার হলো , তার মা-বাবার কষ্টের কিছুটা লাঘব হলো। তার পুরুষ বন্ধুর সেই রাতের ভয়াবহতা হয়তো কমল না, কিন্তু আইনের হাতে অপরাধীদের সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু ভবিষ্যৎ অপরাধ কি কিছুমাত্র কমবে এই দেশে। নাকি হাজারো এমন নির্ভয়া আজও “নিভৃতে” কাঁদছে, ভবিষ্যতেও কাঁদবে।





