লাদাখ সীমান্ত দিয়ে চীন ভারতে অনুপ্রবেশ ঘটানোর পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে নিরন্তর অশান্তি চলছে৷ চীন ও ভারত লাদাখের অ্যাকচুয়াল লাইন অফ কন্ট্রোল (LAC) বরাবর নিজেদের সেনা জমায়েত শুরু করেছে ৷ ওই এলাকায় ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত পাঁচ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে চীন। এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে ইন্দো-চীন বিবাদ মেটাতে তাঁরা মধ্যস্থতাকারী হতে প্রস্তুত ৷ কিন্তু চীন কেনও এই ভাবে স্পর্ধা দেখাচ্ছে তার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে আপাতত কোনও রক্তপাতই চায় না চীন। অযথা উত্তেজনা, রক্তপাত যে শান্তিতে বাধা দেয়! বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন করোনা সঙ্কটে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ‘তিরবিদ্ধ’ হয়ে রয়েছে তাঁদের দেশ। এমনটাই বলছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
তাঁদের মতে, সীমান্তের ওপর-পারের প্রতিবেশীকে বেজিং শুধুই ভাবিয়ে রাখতে চায়। তার জন্য যেটুকু বাগবিতণ্ডা, শক্তির আস্ফালন দরকার, শুধু সেইটুকুই করছে চীনের। ফলে, পড়শির সঙ্গে যেমন সাময়িক মিটমাট হয়ে যায়, তিন বছর আগের ডোকলামের মতো এ বার পূর্ব লাদাখের প্যাংগং হ্রদ আর গালওয়ান উপত্যকার উত্তেজনাও থিতিয়ে যাবে, রাজনৈতিক আলাপ, আলোচনার মাধ্যমেই। তবে সেটাও সাময়িক ভাবে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন কিন্তু ফের উত্তেজনার সৃষ্টি হবে ভারত ও চীনের মধ্যে থাকা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায়। হয়তো হবে আরও ঘন ঘন। আর সেই উত্তেজনার মাত্রায় তারতম্য থাকবে, এলাকা ও সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে।
উহানে উৎপত্তির পর কোভিড-১৯ ভাইরাস যদি বিশ্বত্রাস না-ও হয়ে উঠত, তা হলেও পড়শি ভারতকে এই শক্তির আস্ফালন দেখাতেই হত বেজিংকে। আদ্যোপান্ত ব্যবসা-মনস্ক চিনের রুটি-রুজির প্রয়োজনে। পাকিস্তান, নেপাল-সহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের সঙ্গে উন্নততর বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রয়োজনে নির্মীয়মাণ চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)-কে সুরক্ষিত ও পড়শির নজরদারির ‘বাইরে’ রাখার জন্য। এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
তাই প্যাংগং হ্রদ ও গালওয়ান উপত্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাড়তে বাড়তে যে ‘যুদ্ধে’ পৌঁছবে না, তা নিয়ে অন্তত কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ এক রকম নিশ্চিতই। তবে তাঁরা মনে করছেন, এই ‘যুদ্ধ যুদ্ধ ব্যাপারটা চলবে। কিছু দিন চলার পর তা মেটানো হবে লোকদেখানো ভাবে।
চীন তার রাষ্ট্রক্ষমতা দিয়ে যেমন অনেক কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তেমনই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে জনমতকেও। ভারত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় সেটা পারে না। তা ছাড়াও করোনা সঙ্কটের জেরে আমেরিকা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন-সহ গোটা বিশ্ব অভিযোগের আঙুল তোলায় চিন যে ভাবে কোণঠাসা হয়ে রয়েছে আপাতত, তাতে ভারতের সঙ্গে কোনও যুদ্ধ বা সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক ভাবে আরও একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকি কেনও নেবে তাঁরা?
তাই এ বার ডোকলামের মতো ঘটনাটাও ঘটতে দেখা যাবে না। মাসদু’য়েক কেটে যাওয়ার পরেও ২০১৭-য় ডোকলাম পরিস্থিতি নিয়ে সুর তেমন নরম করতে দেখা যায়নি বেজিংকে। এ বার কিন্তু সার্বভৌমত্বের কথা বলেও চীনকে আলাপ, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটানোর কথা অনেক আগেভাগেই বলতে শোনা যাচ্ছে। তবে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে বেজিং। তার নানা কারণ রয়েছে।
ভারত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা পর্যন্ত পৌঁছনোর রাস্তাঘাট প্রায় সুগম করে ফেলেছে। উন্নত পরিকাঠামো বানিয়ে ফেলেছে ওই সব এলাকায়। যাতে পাকিস্তান, নেপাল-সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর ধরে নিশ্চিন্তে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে উন্নত করার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেজিংয়ের উদ্বেগ বেড়েছে। করোনা সঙ্কটের জেরে চিন থেকে মার্কিন পুঁজি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ভারতে আসার উপক্রম হয়েছে। বোঝার উপর শাকের আঁটি, ভারত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (‘হু’) কার্যনির্বাহী এগজিকিউটিভ বোর্ডের চেয়ার হয়েছে। করোনা সঙ্কটের জেরে হু-র যে বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যই চিন-বিরোধী।






