আজ আবারও চীনের সঙ্গে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভারতের সম্পর্ক। আগ্রাসন দেখাতে সীমান্তের দুই পাড়েই জড়ো হচ্ছে হাজার হাজার সেনা। লড়াই যখন চীনের বিরুদ্ধে তখন অবশ্যম্ভাবী মনে পড়ে চীনের সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একা এক অমর ভারতীয় সৈনিকের কথা। প্রাণের মায়া ত্যাগ করেই জওয়ানরা আসেন দেশের কাজে। কোনও ক্ষুদ্র স্বার্থ নয়, এক বৃহত্তর স্বার্থে তাঁরা নিবেদিত প্রাণ৷ কারণ তাঁরা যোদ্ধা৷ তাঁরা বীর৷ আর বীরেদের ধর্মই বলে, যে কোনও বাধা বিপত্তি প্রতিকুলতার সম্মুখীন হয়ে দেশমাতা ও দেশবাসীর রক্ষা করা৷ এমনই এক অমর যোদ্ধা হলেন বাবা হরভজন সিং, যিনি ‘হিরো অব নাথুলা’ নামেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে পরিচিত৷ আজকের এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাঁকে আরও একবার স্মরণ করে নেওয়া যাক৷

যাঁরা পূর্ব সিকিমে ঘুরতে গিয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই দর্শন করেছেন বাবা হরভজন সিংয়ের মন্দির৷ তাঁর ভক্তের সংখ্যা অগণিত৷ তিনি হয়তো প্রথম ভারতীয় সৈনিক যাঁকে ভগবানের পুজো করে সেনাবাহিনী। তাঁকে বাবা নামে সম্বোধন করেন৷ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে, ভারতীয় সেনাদের বেশিরভাগেরই বিশ্বাস তাঁর আত্মা নাথুলা পাস এবং সাইনো-ইন্ডিয়ান সীমান্তে কাজ করা প্রত্যেক সেনার জীবন রক্ষায় সদাসতর্ক। অনেকেই বিশ্বাস করেন, যাঁরা বাবাকে বিশ্বাস করেন, বাবা তাঁদের সবসময় সাহায্য করেন৷ হরভজন সিং এর জন্ম ১৯৪৬ সালের ৩০শে অগাস্ট। ১৯৬৫ সালে তিনি পাঞ্জাব রেজিমেন্টে যোগদেন। ১৯৬৮ সালে ২২বছর বয়সী এই যোদ্ধা কর্মরত ছিলেন পূর্ব সিকিমের নাথুলায়। এই গিরিপথ তার কয়েক বছর আগেই সাক্ষী ছিল ভারত-চীন যুদ্ধের। যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলেও সিকিম তিব্বতের মাঝে অবস্থিত নাথুলা সবসময়ই অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থান। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মালবাহী পশুর পিঠে পণ্য নিয়ে হরভজন রওনা দিয়েছিলেন প্রত্যন্ত ও দুর্গম আউটপোস্টের পথে। সেখানে তাঁর অপেক্ষায় অন্য সেনা জওয়ানেরা। সময়টি ছিল ১৯৬৮-র অক্টোবর। কিন্তু নিজের গন্তব্যে আর কোনদিনও পৌঁছাননি হরভজন সিং। যে ভারবাহী পশু গুলোকে তিনি নিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন ফিরে আসে সেই আউট পোস্টে যেখান থেকে হরভজন রওনা হয়েছিলেন। সহকর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারেন কোনও বিপদে পড়েছেন হরভজন। তাঁর সন্ধানে শুরু হয় খোঁজ। কিন্তু না তিন চারদিন ধরে তার নির্ধারিত যাত্রাপথে খুঁজেও হরভজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। লোকশ্রুতি হরভজন সিং উদ্ধারকারী দলকে নাকি সাহায্য করেন তাঁর দেহ খুঁজে বের করতে৷ শুধু তাই নয়, তাঁর এক সহকর্মীকে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করার জন্য স্বপ্নাদেশও নাকি দেন তিনি৷

তাঁর সাহসিকতা ও কাজের জন্য তাঁকে মরণোত্তর মহাবীর চক্র প্রদান করা হয়৷
কিছু ভারতীয় সেনা মনে করেন ইন্দো-চিন যুদ্ধের আগে বাবা ভারতীয় সেনাদের এই আসন্ন আক্রমনের বিষয়ে সতর্ক করেন৷ নাথুলার সেনাদের সংগ্রহ করা কিছু অর্থ প্রতিবছর বাবা হরভজনের মা কে পাঠানোর কথা আজও শোনা যায়৷

বাবার স্মৃতিসৌধে গেলে দেখতে পাবেন, এটি একটি শয়নকক্ষের মতো কিছুটা, যেখানে তাঁর পোষাক, জুতো, বিছানা, কম্বল সবকিছু রাখা আছে৷ শুধু তাই নয়, তাঁর জন্য নির্দিষ্ট একটি কার্যালয়ও রয়েছে৷ পাহারারত জওয়ানদের দাবি সেই পরিপাটি ঘর মাঝে মাঝেই এলোমেলো হয়ে যায়। তাঁদের বিশ্বাস হরভজন নিজে এসে বিশ্রাম নেন সেই ঘরে। তার জুতো জোড়াও নাকি প্রমাণ দেয় তিনি সীমান্তে টহল দেন। পরিষ্কার জুতোতে মাঝেমাঝেই লেগে থাকে ধুলো কাদা।

বাবাকে নিয়ে প্রচলিত এমন অনেক গাথা রয়েছে যা একটু কান পাতলেই শোনা যায়৷ তাঁর সাহসিকতা, সাহায্যের মনোভাব, তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে অমর করে রেখেছে সকলের মনে৷ শুধু তাই নয়, তাঁর কাজ আজও শত শত সেনা জওয়ানদের উদ্বুদ্ধ করে কাজে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে৷
শুধু জীবদ্দশায় নয়, মৃত্যুর ওপার থেকেও তিনি সজাগ, তিনি যেন বদ্ধ পরিকর সকলকে সাহায্য করতে৷ তিনি যোদ্ধা, তিনি বীর, তিনি অমর প্রতিটি ভারতীয় সৈনিকের কাছে৷ ভারতবাসীর কাছে৷ সীমান্তে আজও একাকি নিজের কর্তব্য অবিচল এই অমর সেনা।






