দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বরাবরই সংবেদনশীল। বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত এবং মায়ানমারের অশান্ত রাখাইন প্রদেশকে ঘিরে যে জটিল সমীকরণ রয়েছে, তা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সাম্প্রতিক দিনে হঠাৎ করেই বাংলাদেশের চট্টগ্রামে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি এবং এর পালটা প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় সেনাদের মায়ানমারে পাঠানো – এই দুই ঘটনাই বিশেষজ্ঞ মহলে এক নতুন ধন্দ তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষও ভাবছেন, এ কি নিছক কাকতালীয়, নাকি বড় কোনও ভূ-রাজনৈতিক খেলার অংশ?
চট্টগ্রাম শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত উপকূলে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। ঠিক এই জায়গাতেই চলতি মাসের ১০ তারিখ মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০ জে সুপার হারকিউলিস বিমান নেমেছিল শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। তারপর থেকে অন্তত ১২০ জন মার্কিন সেনা ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। তাঁরা একটি হোটেলে থেকেও আনুষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশনের বাইরে রয়েছেন। জানা যাচ্ছে, এটি আসলে ‘অপারেশন প্যাসিফিক অ্যাঞ্জেল ২৫-৪’-এর অংশ, যেখানে ১৫ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বিমান বাহিনী যৌথ মহড়া চালাচ্ছে। কিন্তু কেন এত গোপনীয়তার আবরণে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে, ঠিক একই সময়ে ভারতও নীরবে পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি আইএল-৭৬ পরিবহন বিমান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর ১২০ জন সদস্য নিয়ে মায়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে নামে। ‘ভারত-মায়ানমার পারস্পরিক সামরিক সাংস্কৃতিক বিনিময়’-এর তৃতীয় সংস্করণ এটি। ১৬ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে অপারেশনাল সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের পাশাপাশি কৌশলগত বোঝাপড়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই পদক্ষেপ শুধু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার নয়, বরং মার্কিন উপস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাবের পাল্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ ও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম বহু বছর ধরেই অশান্ত। আরাকান আর্মি-সহ বিভিন্ন বিদ্রোহী সংগঠন জুন্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে। সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে এই বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতও তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’-র অংশ হিসেবে মায়ানমারের সেনা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করছে। কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রজেক্টের মতো বড় উদ্যোগ বাস্তবায়নে এই সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ Mu*rder case : পরিবারের ছোটখাটো ঝগড়া থেকে মর্মান্তিক ঘটনা! পিটিয়ে মাকে খু*ন করল ছেলে!
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে মার্কিন সেনা এবং মায়ানমারে ভারতীয় সেনাদের কার্যক্রম নিছকই সামরিক মহড়া নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের এই অঞ্চল আবারও আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আগামী দিনে এই ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে গোটা দক্ষিণ এশিয়া।





