সমাজে নারীদের প্রতি অন্যায়, বৈষম্য এবং নিগ্রহের ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সমাজে মেয়েদের ওপর নানারকম নির্যাতন চলে এসেছে। কখনো ধর্মের নামে, কখনো সংস্কারের নামে, আবার কখনো ব্যক্তিগত লালসা চরিতার্থ করার জন্য মেয়েদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও, শিক্ষার আলো জ্বললেও এই নির্যাতনের প্রবাহ থামেনি। বিশেষত, সংস্থাগত বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় যখন এমন ঘটনা ঘটে, তখন তা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কারণ, এখানে ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই হয় শিশু বা কিশোরী, যারা আত্মরক্ষার উপায় জানে না, কিংবা জানলেও ভয় বা সামাজিক লজ্জার কারণে মুখ খুলতে পারে না।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা আধ্যাত্মিক আশ্রমগুলিকে সাধারণত শান্তি, ধ্যান, আত্মশুদ্ধির স্থান বলে মনে করা হয়। বহু মানুষ জীবনের দুঃখ-দুর্দশা ভুলতে বা নতুন পথ খুঁজতে এসব প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। কিন্তু একাধিকবার দেখা গেছে, এই আস্থার জায়গাগুলিই ভয়ঙ্কর অন্যায়ের আখড়া হয়ে উঠেছে। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন বহু ধর্মীয় আশ্রম বা গুরুদেবদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন, প্রতারণা, এমনকি শিশু নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দোষীরা অধরা থেকে যায়। বিশেষ করে যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মদত পান, তখন তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা তো দূরের কথা, ভাবাটাও সাহসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি এমনই এক গুরু ও তাঁর সংস্থা নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
আধ্যাত্মিক গুরু সদগুরু জগ্গি বাসুদেবের ‘ইশা ফাউন্ডেশন’ সম্পর্কে ইতিপূর্বেও নানা বিতর্ক উঠেছে। কিন্তু এবার এক সমাজকর্মী ও সাংবাদিক শ্যাম মীরা সিংহের ফাঁস করা কিছু ইমেলের পর সংস্থাটি নতুন করে কাঠগড়ায়। অভিযোগ, ‘ইশা ফাউন্ডেশন’-এর আশ্রমে ব্রহ্মচর্যের দীক্ষার সময় নাবালিকাদের ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত রাখতে বাধ্য করা হয়। এই বিষয়ে সংস্থার এক উচ্চপদস্থ সদস্যা মা প্রদ্যূতা সরাসরি সদগুরুকে ইমেল করেন এবং এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। ইমেলের স্ক্রিনশট অনুযায়ী, প্রদ্যূতা বলেন, ‘নাবালিকা মেয়েদের এইভাবে দীক্ষা দেওয়ার নিয়মে আমি আপত্তি জানিয়েছি আগেও। তাঁরা এখন বাধ্য হলেও ভবিষ্যতে এ নিয়ে মুখ খুলতে পারে।’ সদগুরু যে এই বিষয়ে অবগত ছিলেন, সেটাও ওই ইমেলের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ শ্রমিক নেতার দাদাগিরিতে স্তব্ধ শহর! বিমানবন্দরগামী একাধিক বাস বন্ধ, পথে নাজেহাল যাত্রীরা!
শ্যাম মীরা সিংহের প্রকাশ করা ইমেলগুলির মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি রয়েছে, যেখানে সংস্থার আরেক উচ্চপদস্থ আধিকারিক ভারতী ভি প্রদ্যূতাকে ধন্যবাদ জানান এই নিয়ম বন্ধ করার জন্য। তিনি লেখেন, ‘আমাদের জানা ছিল না যে কিশোরী মেয়েদের এইভাবে দীক্ষা নিতে হয়। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।’ এর আগে ‘ইশা ফাউন্ডেশন’-এর বিরুদ্ধে শিশু নিগ্রহের অভিযোগ উঠলেও তেমন কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি। কিন্তু এবার ইমেল প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক সমাজকর্মী কোয়েম্বত্তূরে সদগুরুর বিরুদ্ধে POCSO আইনে এফআইআর দায়ের করেছেন। পাশাপাশি, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনের কাছেও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
এটি প্রথমবার নয়, এর আগেও ‘ইশা ফাউন্ডেশন’-এর কার্যকলাপ নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর দুই কন্যাকে জোর করে আশ্রমে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে জানায়, দুই মেয়েই স্বেচ্ছায় আশ্রমে রয়েছেন। এছাড়াও, সংস্থার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন যামিনী রাগানি ও তাঁর স্বামী সত্য এন রাগানি। তাঁরা দাবি করেছিলেন, শিশুদের যৌন নিগ্রহ করা হয় এবং এক শিশু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। কিন্তু সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এবার সদগুরুর বিরুদ্ধে ওঠা নতুন অভিযোগের পর প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে নজর রয়েছে সকলের।






