মধ্যমগ্রামের গতকালকের রাতটা এখনও যেন দুঃস্বপ্নের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে বিজেপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে। রাত সাড়ে দশটার কিছু আগে পর্যন্ত সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। ফোনে কথা চলছিল আসন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই বদলে যায় পুরো ছবি। শুভেন্দু অধিকারীর এক্সিকিউটিভ অ্যাসিসট্যান্ট চন্দ্রনাথ রথকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালানোর ঘটনায় এখন তীব্র চাঞ্চল্য রাজ্য রাজনীতিতে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেও তিনি ফোনে কথা বলছিলেন বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের সঙ্গে। সেই কথোপকথনের শেষ কয়েক সেকেন্ড এখনও যেন কানে বাজছে শঙ্করের।
বুধবার রাত প্রায় ১০টা নাগাদ শঙ্কর ঘোষ ফোন করেছিলেন চন্দ্রনাথকে। শুক্রবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কলকাতা সফর এবং শনিবার ব্রিগেডে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান এই দুই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়েই আলোচনা চলছিল। বিজেপির অন্দরে চন্দ্রনাথ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। অনেক নেতা সরাসরি শুভেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে চন্দ্রনাথের মাধ্যমেই সমস্ত সমন্বয়ের কাজ সারতেন। সেদিনও তেমনই স্বাভাবিক কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু আচমকাই কথার মধ্যে জড়তা টের পান শঙ্কর। তাঁর দাবি, হঠাৎ যেন একাধিক মানুষের গলা ভেসে আসে ফোনের ওপারে। তিনি বারবার ডাকতে থাকেন, “চন্দ্র… চন্দ্র… শরীর খারাপ লাগছে নাকি?” কিন্তু আর কোনও উত্তর মেলেনি। কয়েক মুহূর্ত পর ফোন কেটে যায়। ফের ফোন করলে এক ব্যক্তি ফোন ধরে জানান, “স্যারকে গুলি করে দিয়েছে।” সেই মুহূর্তটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না শঙ্কর ঘোষ।
খবর পাওয়ার পরই কাঁপা হাতে শুভেন্দু অধিকারীকে বার্তা পাঠান শঙ্কর। তখন শুভেন্দু কলকাতা ছেড়ে কোলাঘাটের দিকে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। মেসেজ দেখেই তিনি ফোন করে হতবাক গলায় জানতে চান, “কী বলছেন শঙ্কর?” এরপর দ্রুত মধ্যমগ্রামের দিকে যেতে বলেন শঙ্করকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিভা সিটি হাসপাতাল চত্বরে জড়ো হন একের পর এক বিজেপি বিধায়ক, নেতা এবং কর্মীরা। হাসপাতালের ওয়েটিং লাউঞ্জে তখন উদ্বেগ, আতঙ্ক আর ক্ষোভ তিনটেই একসঙ্গে মিশে রয়েছে। পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। হাসপাতালের ভিতরে তখনও চন্দ্রনাথের দেহ থেকে গুলি বের করার কাজ চলছে। সূত্রের দাবি, খুব কাছ থেকে নাইন এমএম পিস্তল দিয়ে গুলি চালানো হয়েছিল। পাঁচটি গুলি লাগে চন্দ্রনাথের বুকে। তাঁর গাড়ির চালকও গুরুতর জখম হন। তবুও রক্তাক্ত অবস্থায় কোনওরকমে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দেন তিনি। পিছনের সিটে থাকা আরেক সহযোগী মাথা নিচু করে বসে পড়ায় প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সুশান্ত সরকারের বয়ান এই খুনকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। তিনি জানিয়েছেন, রাত ১০টা থেকে ১০টা ২০-র মধ্যে তিনি এলাকায় পথকুকুরদের খাবার দিচ্ছিলেন। আচমকাই কয়েকজনকে দৌড়ে যেতে দেখে জানতে চান কী হয়েছে। তখনই শোনেন, “গুলি করে দিয়েছে।” স্করপিওর কাছে পৌঁছে তিনি দেখেন, গাড়ির কাচ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে, ভিতরটা রক্তে ভাসছে। দরজা খুলতেই ভিতর থেকে কেউ বলে ওঠেন, “স্যারকে গুলি মেরে দিয়েছে।” সুশান্তর দাবি, তখনও চন্দ্রনাথ এবং চালক দু’জনেরই শ্বাস চলছিল। তাঁরা কিছু বলারও চেষ্টা করছিলেন। তিনি দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং থানায় ফোন করেন। তাঁর আরও দাবি, স্করপিওর সামনে একটি নম্বরবিহীন ছোট চারচাকা গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। তদন্তকারীদের অনুমান, সেই গাড়ি দিয়েই রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছিল যাতে স্করপিও পালাতে না পারে। তারপর বাইকে এসে আততায়ীরা খুব কাছ থেকে গুলি চালায়।
আরও পড়ুন: ‘বাংলার রাজনীতি ছাড়লাম’ বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল, তৃণমূল হারতে ফের বিজেপিতে ফেরার ইচ্ছা? সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে, পরিবারকে রক্ষা করতে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা রূপাঞ্জনা মিত্রের!
এই খুনকে কেন্দ্র করে এখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নাকি পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং কোন তত্ত্বের দিকে এগোচ্ছে তদন্ত? পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া নম্বরবিহীন গাড়িটি চুরি করা ছিল। সিআইডি (CID) এবং ফরেনসিক দল ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল ঘুরে নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। হাসপাতালের ভিতরে সেদিন রাতেই রাজ্যের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত শুভেন্দু অধিকারীকে জানান, পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে ঘটানো হয়েছে। চন্দ্রনাথ কোন রাস্তা দিয়ে ফিরবেন, কোন গাড়িতে থাকবেন সব তথ্য আগেই জেনে রেখেছিল আততায়ীরা। আর সেই কারণেই এই হামলা এত নিখুঁত ভাবে ঘটানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। এখন গোটা রাজ্যের নজর একটাই প্রশ্নে চন্দ্রনাথ রথ খুনের নেপথ্যে আসলে কারা?





