অর্থোপার্জনের তাগিদে পরিযায়ী বাংলার শ্রমিকদের, আর ঘর ফেরা হলো না, দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাল মিলন, আজিতরা

বাবার অসুখের পয়সা জোগাড়ের তাড়নায় পররাজ্যবাসী হয়েছিল ছোট ছেলে। লকডাউনের মধ্যে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেও আর বাড়ি ফেরা হলো না তাঁর। পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন এলাকার আরও কিছু পরিযায়ী শ্রমিক।

“বাবার যক্ষ্মা হয়েছিল। সেই জন্যই তাঁর দুই ছেলে অৰ্থ উপার্জনে গিয়েছিল রাজস্থানে। বড়টা আগে চলে এলেও ছোটটা বাবার অসুখ সারানোর খরচ হওয়া টাকা কিছু জমিয়ে গ্রামে ফেরার পণ করেছিল। “কাঁদতে কাঁদতে এমনটাই বললেন উত্তরপ্রদেশে পথ দুর্ঘটনায় মৃত বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক মিলন বাদ্যকারের মা। আর তার হতভাগ্য বাবা এখন নিজের রোগ নিয়ে আফসোস করে বলছেন,” রোগটা হল বলেই জোয়ান ছেলেটার প্রাণটা অকালে চলে গেল!”

তৃতীয় দফার লকডাউনের মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়ভার নেয় সরকার। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে রাজস্থান থেকে ফেরার পথে শনিবার ভোররাতে উত্তরপ্রদেশের অরাইয়া এলাকায় লরি দুর্ঘটনায় ২৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন পুরুলিয়া মফস্বল থানার ছররা-দুমদুমী গ্রামের বাসিন্দা মিলন বাদ্যকার। রাজস্থানের মার্বেল কারখানায় কাজ পেয়েছিলেন তিনি। সেখানে বেতন বাবদ মাসে আট হাজার টাকা পেতেন। তার মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা পরিবারের কাছে পাঠাতেন। দুর্গাপুজোর পর সেই যে ঘর ছেড়েছিল তারপর আর ঘরে ফেরেননি ২২ বছরের মিলন। দাদা দেবাশিস ফিরে এলেও ভাই সংসারের আর্থিক স্বচ্ছলতার কথা ভেবে সেখানেই থেকে যান। আর সেটাই তাঁর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াল। এদিন দুপুর দিকে পুরুলিয়া মফস্বল থানার পুলিশের কাছে মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর সুবাষী দেবী বলেন , “আর ওই ছেলে বলবে না, মা, আমি ভাল আছি। তুই চিন্তা করিস না।”

একই ছবি ওই দুর্ঘটনায় মৃত বাংলার তথা পুরুলিয়ার আরও তিন পরিযায়ী শ্রমিকের বাড়িতেও। এদিন দুপুরে পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় ওই ছররা-দুমদুমী গ্রামের বাসিন্দা মৃত চন্দন রাজোয়াড়ের বাড়ি যেতেই তার পরিবারের লোকজন ভেঙে পড়েন। তাঁর মেজ ভাই রাজীব অনুরোধ করেন, “ভাই-র দেহ যাতে এখানে আনা হয় তার ব্যবস্থা করুন। একবার শেষ দেখাটা যেন আমরা দেখতে চাইছেন।” আসলে এই জেলায় যে কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগেরই মৃতদেহ দাহ হয়ে গিয়েছে সেখানেই।

কোটশিলার উপরবাটরি গ্রামের বাসিন্দা মৃত অজিত চন্দ্রের স্ত্রী উর্মিলা মাহাতো বলেন, “গত বৃহস্পতিবার সকাল বেলায় যখন রাজস্থান থেকে পায়ে পথ চলা শুরু করে ছিল তখনই শেষবারের মত কথা হয়েছিল। বলেছিল চিন্তা কোরো না, বাড়ি আমি ফিরবই। আমি নিজেই তোমাদের সাথে যোগাযোগ করে নেব।” কিন্তু তারপর আর ফোন এলো না। এদিন দুপুরের দিকে কোটশিলা থানার থেকে খবর আসে পথ দুর্ঘটনায় ম়ৃত্যু হয়েছে অজিতের । তখনই যেন মাথায় বজ্ররাঘাত হয় উর্মিলা দেবীর।

বিকালে জয়পুর থানার পুলিশের কাছ থেকে এই দুর্ঘটনার খবর পায় গণেশ রাজোয়াড়ের পরিবারও। তার বাড়ি জয়পুরের ঝালমামড়ো গ্রামে হলেও সে তার মামার বাড়ি পুরুলিয়া মফস্বলের বোঙাবাড়িতে থাকতেন। সেখান থেকেই তিনি রাজস্থানে কাজ করতে যান। তার মৃত্যু সংবাদে বাবা তারাপদ রাজেয়াড় বলেন, “সব শেষ হয়ে গেল। শেষ দেখাটা একবার যেন দেখতে পাই।” চার মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবার এখন তাদের মৃতদেহকে একটি বার দেখার অপেক্ষায় আকুল হয়ে আছে।

আরও অন্যান্য খবর