শেষবেলায় অসুস্থ শরীর নিয়েও চালিয়ে গেছেন অভিনয়, পাশে ছিল না মেয়ে-জামাই! অর্থের প্রয়োজনে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত করেছেন লড়াই! শত কষ্ট বুকে চেপে রেখেই চিরবিদায় জানালেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়

বাংলা বিনোদন জগৎ আজ শোকে আচ্ছন্ন। প্রয়াত বর্ষীয়ান অভিনেত্রী বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নিজ বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার, কিডনি ও হার্টের সমস্যায় ভুগছিলেন। বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৮ বছর। শেষ কিছু মাস ধরে শারীরিক কষ্ট ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।

অভিনয়ের জগতে বাসন্তী দেবীর যাত্রা শুরু বহু বছর আগে। উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেনদের সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন। পরবর্তীতে পর্দায় তাকে দিদা, ঠাকুমা, বয়স্ক চরিত্রে দেখা যেত, বিশেষ করে ধারাবাহিক ‘গীতা এলএলবি’-তে ব্রজবালা দেবীর ভূমিকায় তিনি দর্শকের প্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু গ্ল্যামারের আড়ালে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল ভীষণ কষ্টের।

শেষ বয়সে সংসার চালানো, চিকিৎসার খরচ—সবকিছুই তাঁকে নিজের জমানো টাকা থেকে সামলাতে হত। অসুস্থ শরীর নিয়ে দমদম থেকে সোনারপুর পর্যন্ত শুটিংয়ে যেতেন, কারণ শুটিং ছিল তাঁর নেশা। নিজেই বলেছিলেন, “সকাল ১০টা বাজলেই মনে হয় শুটিং যাই। শুটিং না থাকলে মন খারাপ হয়।”

তবে এই পথ মোটেই সহজ ছিল না। ফিজিওথেরাপির সময় পা বেঁকে যাওয়ায় হাঁটতে অসুবিধা হয়, বন্ধ হয়ে যায় শুটিং, আর তার সঙ্গে রোজগারও। মাসে ২০ হাজার টাকার ওষুধ, সাড়ে চার হাজার টাকার ইনজেকশন—সব মিলিয়ে খরচ ছিল বিপুল। পরিবার থেকেও খুব বেশি সাহায্য পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। ড্রাইভার মলয় চাকি দাবি করেছিলেন, হাসপাতালে ভর্তি থাকা সত্ত্বেও মেয়ে একবারও দেখতে যাননি। যদিও জামাই শঙ্কর চক্রবর্তী এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী অসুস্থ থাকায় বের হতে পারেননি এবং চিকিৎসার খরচ তাঁরাই বহন করেছেন।

এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কর্মজগতের বন্ধুরা। ‘গীতা এলএলবি’-র প্রযোজক স্নেহাশিস চক্রবর্তী তাঁকে ৯০ হাজার টাকা সাহায্য করেছিলেন। সহ-অভিনেতা ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সাহায্যের আবেদন জানালে প্রায় ২ লাখ টাকা জোগাড় হয়। ভাস্বর বললেন, “ধারাবাহিকে মা ছিলেন, মনে হচ্ছে সত্যিই মাকে হারালাম।” মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও সহায়তার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।

গত মার্চ মাসে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিচারিকা ছিলেন তাঁর নিত্যসঙ্গী, যিনি শেষদিন পর্যন্ত তাঁর যত্ন নিয়েছেন। গৃহসহায়িকার কথায়, “গত ছ’মাস খুব কষ্টে ছিলেন। হঠাৎই চলে গেলেন। এখন যেন শান্তি পান।” শেষ বয়সে নিঃস্ব প্রায়, তবু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে যেন সব ভুলে যেতেন। প্রযোজকের স্ত্রী রূপসা চক্রবর্তী স্মৃতিচারণে বললেন, “শরীর না দিলেও রোজ দমদম থেকে টালিগঞ্জে এসে শুটিং করতেন। ক্যামেরা অন হলেই অন্য মানুষ হয়ে যেতেন।”

আরও পড়ুনঃ  Delhi stray dogs:দিল্লির পথ কুকুরদের আশ্রয়ে পাঠানোর নতুন নিয়ম কি সত্যিই সমস্যার সমাধান করবে ?

‘ঠগিনী’, ‘আমি সে ও সখা’সহ একাধিক ছবিতে স্মরণীয় অভিনয় করে গেছেন বাসন্তী দেবী। তাঁর চলে যাওয়া শুধু ইন্ডাস্ট্রির জন্য নয়, দর্শকদের কাছেও এক গভীর শূন্যতা। শেষ বেলায় লড়াই ছিল একাকীত্ব, অসুস্থতা আর সংসারের তাগিদের সঙ্গে। আজ সব লড়াই থামিয়ে তিনি চলে গেলেন চিরশান্তির পথে।

RELATED Articles