শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ২০১৬ সালের এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতির রায় ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যে তুমুল রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর আমলে কি সব ঠিকঠাক ছিল? ইতিহাস বলছে, বামফ্রন্টের সময়ও নিয়োগ দুর্নীতি হয়েছিল, এবং জলপাইগুড়ির ২০১০ সালের ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
শিক্ষকতা পেশা একসময় সম্মানের প্রতীক ছিল। যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতেই শিক্ষক নিয়োগ হত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছু। এখন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে এসএসসি দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে ঠিকই, কিন্তু সেই একই অভিযোগ একসময় বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধেও উঠেছিল। জলপাইগুড়ির ২০১০ সালের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ওঠা বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় আসছে, যেখানে স্বজনপোষণের অভিযোগ প্রবল হয়েছিল।
২০১০ সালে জলপাইগুড়িতে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ১২ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নেন এই পরীক্ষায়। লিখিত পরীক্ষার পর ৬৫০০ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। পরবর্তীতে ১৪১১ জনের চূড়ান্ত প্যানেল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্যানেলের তালিকা প্রকাশ্যে আসতেই বিতর্কের ঝড় ওঠে। দেখা যায়, সেই তালিকায় সিপিএমের তৎকালীন জেলা সম্পাদকের পুত্রবধূ, সংসদ চেয়ারম্যানের স্ত্রীসহ একাধিক প্রভাবশালী নেতার আত্মীয়দের নাম রয়েছে। অভিযোগ ওঠে, যোগ্যতা নয়, বরং রাজনৈতিক সুপারিশ ও স্বজনপোষণের মাধ্যমে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জলপাইগুড়িতে রাজনৈতিক চাপানউতোর চরমে ওঠে।
প্রথমদিকে সিপিএম নেতৃত্ব বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, সংবাদমাধ্যমে একের পর এক তথ্য ফাঁস হতে থাকে। স্বচ্ছ নিয়োগের পক্ষে বরাবর সওয়াল করা দলটি নিজেই চাপের মুখে পড়ে যায়। বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্রর মতো রাজ্য নেতারা জলপাইগুড়িতে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দলের একাংশই স্বীকার করে নেন, নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৫ জন নবনিযুক্ত শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয় এবং সংসদের চেয়ারম্যান ও সচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুনঃ Mamata Banerjee : “কে পড়াবে এবার?”—২৬ হাজার চাকরি বাতিলের পর শিক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুললেন মমতা!
এই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে বামফ্রন্ট সরকার। ৪২৩ জন নবনিযুক্ত শিক্ষককে শোকজ করা হয়। যদিও এর মধ্যেই রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসে এবং এই ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। তবে বর্তমান এসএসসি দুর্নীতির প্রসঙ্গে যখন সিপিএম কড়া ভাষায় রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করছে, তখনই জলপাইগুড়ির ২০১০ সালের ঘটনাটি নতুন করে সামনে আসছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, বাম জমানায় হওয়া নিয়োগ দুর্নীতির দায় এড়িয়ে কি সিপিএম বর্তমান পরিস্থিতিতে নৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে পারবে?





