বাংলার রাজনীতির ইতিহাস ঘাঁটলে একটা সময় ছিল, যখন বামপন্থীদের ছাড়া ভোটের ময়দান কল্পনাই করা যেত না। লালঝড়ের প্রভাব ছিল সর্বত্র—গ্রাম থেকে শহর, মিল-কলকারখানা থেকে শিক্ষাঙ্গন। একটা সময় ছিল, যখন রাস্তায় নামলেই চোখে পড়ত লাল ঝান্ডার মিছিল। কিন্তু সেই দিন এখন অতীত। সময়ের স্রোতে একসময় যে দল বাংলার শাসক ছিল, তারা এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। আজকের নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না, রাজ্যে একসময় টানা ৩৪ বছর শাসন করেছে এই দল। সময়ের পালাবদলে আজকের পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, রাজ্যের বিধানসভা ও লোকসভায় বামেরা কার্যত নিশ্চিহ্ন। এবার কি সেই একই পরিণতি হতে চলেছে রাজ্যসভাতেও?
২০০৬ সালে বাংলার মানুষ শেষবারের মতো দুহাত ভরে আশীর্বাদ করেছিল বামফ্রন্টকে। বিধানসভায় তারা জিতেছিল ২৩৫ আসনে। সিপিএম তখন বাংলার রাজনীতির অপ্রতিরোধ্য শক্তি। কিন্তু ওটাই ছিল শেষ উত্থান। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের আসন কমে দাঁড়ায় ৬২-তে। এরপর ২০১৬-তে তা আরও কমে যায়। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে বামেরা একেবারে শূন্য হয়ে যায়। লোকসভাতেও একই চিত্র। ২০১৯ সালে কোনও আসন পায়নি তারা। এবার রাজ্যসভাতেও কি সেই পরিণতি হতে চলেছে?
২০২০ সালে কংগ্রেসের সমর্থনে সিপিএম রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। বিধানসভায় বামেদের একজনও বিধায়ক নেই। ফলে বিধানসভা ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বামেদের। অর্থাৎ, এবার রাজ্যসভায় আর কোনও প্রতিনিধি পাঠাতে পারবে না তারা। এতদিন রাজ্যসভায় বামেদের যে শেষ প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁর মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে। এর পর রাজ্যসভাতেও শূন্য হয়ে যাবে লাল পার্টি।
বামেরা কেন এই পরিণতির মুখে পড়ল? দলের একটা অংশ বলছে, সুবিধাবাদী রাজনীতি এবং ভুল কৌশলের কারণেই আজ এই দুর্দশা। আবার অনেকে মনে করছেন, রাজনীতিতে উত্থান-পতন স্বাভাবিক চক্র। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য নিজেও সে কথাই বলছেন। তাঁর মতে, “সংসদীয় রাজনীতিতে এমন ওঠানামা হয়। একসময় লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে ৬০ জনেরও বেশি সাংসদ ছিলেন বামেদের। ভোটে জিততে না পারার কারণে সংখ্যা কমতে কমতে শূন্য হয়েছে। তবে আবার ফেরা সম্ভব।” তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সেই ফেরা খুব সহজ হবে না।
আরও পড়ুনঃ BJP : বিজেপিতে বড়সড় পরিবর্তন! ৭০% জেলা সভাপতিকে বদল, ভোটের আগে নতুন পরিকল্পনা?
আগামী ২ এপ্রিল রাজ্যসভার পাঁচজন সাংসদের মেয়াদ শেষ হবে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, সুব্রত বক্সি, মৌসম বেনজির নূর, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাকেত গোখলে। বাংলার ১৬টি রাজ্যসভার আসনের নির্বাচন তিন দফায় হয়। প্রথম দফায় ৬টি আসনের জন্য প্রয়োজন ৪২ জন বিধায়কের সমর্থন। পরবর্তী দুই দফায় দরকার ৫০ জন করে। কিন্তু বিধানসভায় বামেদের কোনও বিধায়ক না থাকায় এবার তাদের জন্য কোনও আসন থাকবে না। বরং সেই জায়গা দখল করতে পারে বিজেপি। বাংলার রাজনীতির এই পরিবর্তন কি স্থায়ী, নাকি ভবিষ্যতে বামেরা আবার ঘুরে দাঁড়াবে? সময়ই দেবে তার উত্তর।





