রাজ্য সরকার ও চিকিৎসকদের মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই সংবেদনশীল। সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক-রোগীর অনুপাত নিয়ে বহুদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। রাজ্য সরকার একদিকে স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি আনতে চায়, অন্যদিকে চিকিৎসকরা কাজের পরিমাণ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন বারবার। বিশেষ করে, সরকারি চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ করা ও প্রাইভেট প্র্যাকটিস সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে অসন্তোষ নতুন নয়। সম্প্রতি, রাজ্য সরকার চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তন আনতে চলেছে, যা এই টানাপোড়েন কতটা মেটাবে, তা নিয়ে চর্চা চলছে।
কিছু বছর আগে এক মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা চিকিৎসক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল। নিরাপত্তাহীনতা ও কাজের চাপে অনেক চিকিৎসক সরকারি হাসপাতাল ছেড়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলে গিয়েছেন। এছাড়া, সরকারি চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও প্রাইভেট চেম্বার চালানোর বিধিনিষেধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ রয়েছে। কিছুদিন আগেই সরকার নির্দেশ দিয়েছিল, সরকারি চিকিৎসকরা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। এমনকি, তাদের কর্মক্ষেত্রের ২০ কিমির বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অনুমতি ছিল না।
এই প্রেক্ষাপটে সোমবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার ধনধান্য অডিটোরিয়ামে চিকিৎসকদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সেখানে চিকিৎসকদের নানা অভিযোগ ও পরামর্শ শোনেন তিনি। চিকিৎসকদের কাজের পরিধি ও দায়িত্ব নিয়ে নতুন নীতি ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রাইভেট প্র্যাকটিস সংক্রান্ত বিধিনিষেধ খানিকটা শিথিল করা হয়েছে। আগে যেখানে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে চিকিৎসকরা প্রাইভেট চেম্বার খুলতে পারতেন, সেখানে এবার তা বাড়িয়ে ৩০ কিলোমিটার করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘সরকারি পরিষেবা আগে দিন, তারপর প্রাইভেট প্র্যাকটিস করুন। তবে আমি ২০ কিলোমিটারের সীমা বাড়িয়ে ৩০ কিলোমিটার করে দিলাম।’’
আরও পড়ুনঃ মদ্যপ যুবকদের তাণ্ডব! গাড়ি ধাওয়া, কটূক্তি, নোংরা অঙ্গভঙ্গি…! শেষমেশ প্রাণ হারালেন তরুণী!
তবে, মুখ্যমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় ঘোষণা ছিল চিকিৎসকদের বেতন বৃদ্ধি। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ইন্টার্ন, হাউজস্টাফ ও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিদের বেতন ১০ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, সর্বস্তরের সিনিয়র রেসিডেন্টদের বেতন ১৫ হাজার টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে ডিপ্লোমাধারী সিনিয়র রেসিডেন্টদের বেতন ৬৫ হাজার থেকে বেড়ে হলো ৮০ হাজার টাকা। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সিনিয়র রেসিডেন্টদের বেতন ৭০ হাজার থেকে বেড়ে হলো ৮৫ হাজার। এবং পোস্ট ডক্টরেট সিনিয়র রেসিডেন্টদের বেতন ৭৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণায় চিকিৎসক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
একাংশ মনে করছে, রাজ্যের এই সিদ্ধান্ত চিকিৎসক ও সরকারের সম্পর্ক মেরামত করতে পারে। তবে, অন্যদের মতে, শুধুমাত্র বেতন বৃদ্ধি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, হাসপাতালে পরিকাঠামোগত উন্নতি, এবং কাজের চাপ কমানো নিয়েও পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের মনোবল বাড়তে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।





