কিছুদিন আগেই রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে এক সভামঞ্চে বলতে শোনা গিয়েছিল যে “তৃণমূল করলে চাকরি পাওয়া যাবে”। আর যারা তৃণমূল করে না? যারা পরিশ্রম করে নিজের মেধা দিয়ে কষ্ট করে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে, তাদের কী হবে? তাদের জায়গা কী তবে সেই আন্দোলন সভায় নাকি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে তারাও বেছে নেবে অন্য কোনও পথ? যেমনটা হয়েছে নিমতার প্রদীপ্তর সঙ্গে।
২০০৯ সালে পিতৃহারা হন প্রদীপ্ত। তাঁর বাবা চাকরি করতেন পরিবহণ দফতরে। ৫২ বছর বয়সে চাকরিরত অবস্থাতেই মৃত্যু হয় তাঁর। নিয়ম রয়েছে, কোনও সরকারি চাকুরীজীবী যদি চাকরি থাকাকালীন অবস্থায় মারা যান, তাহলে তাঁর ছেলে, মেয়ে বা স্ত্রী সেই চাকরি পাবেন। কিন্তু তেমনটা ঘটেনি প্রদীপ্তর সঙ্গে। নিজের প্রাপ্য চাকরি পান নি তিনি।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক প্রদীপ্ত। এরপর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক নিয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করেছিলেন তিনি। বাবার অকাল মৃত্যুর পর সংসারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। নিজের প্রাপ্য চাকরি পেতে পরিবহণ দফতরে ছোটেন তিনি। নিয়মমাফিক পরীক্ষা দিয়ে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হন প্রদীপ্ত। কিন্তু আজ ১২ বছর পরও এসে পৌঁছয় নি চাকরির চিঠি।
বাড়িতে বৃদ্ধা মা ও বোন। সংসার কীভাবে চলবে? হন্যে হয়ে নানান মন্ত্রীদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন প্রদীপ্ত। কাগজপত্র নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুয়ারেও। কিন্তু লাভ কিছুই হয়নি। প্রশ্ন রেখেছেন নিজের হকের চাকরি তিনি কেন পাবেন না? কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশার আলো খুঁজে পান নি নিমতার প্রদীপ্ত।
বিয়ে করেছেন। সংসারে রয়েছে স্ত্রী, দুই সন্তান। ১২ বছর ধরে অপেক্ষা করেছেন এই বুঝি চাকরিতে যোগ দেওয়ার চিঠি এলো। কিন্তু তা হয়নি। বয়স পেরিয়ে গিয়েছে ৪০ বছর। শেষ পর্যন্ত বাধ্য এখন সাইকেল নিয়ে দোকানে দোকানে বিস্কুট, লজেন্স ফেরি করে বেড়াচ্ছেন প্রদীপ্ত। এম.এ পাশ করা একজন মানুষ আজ ফেরিওয়ালা।
ভাগ্যের এই নিষ্ঠুর পরিহাস মেনে নিয়েছেন প্রদীপ্ত। বুঝেই গিয়েছেন গত ১২ বছরে যখন নিজের প্রাপ্য চাকরি পান নি। এখন আর সে বিষয়ে ভেবে লাভ নেই। সংসার তো চালাতে হবে। তাই সাইকেলে করে ফেরি করার জীবনই বেছে নিয়েছেন এক উচ্চশিক্ষিত।
এখান থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, একদিকে মুখ্যমন্ত্রী যখন রাজ্যে বিনিয়োগ টানার জন্য দিল্লি, মুম্বই সফর করে বেড়াচ্ছেন, তখন অন্যদিকে এমন নানান উচ্চশিক্ষিত মানুষগুলো অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছেন। কেন যোগ্য হয়েও নিজের যোগ্যতার সমান চাকরি পাবে না এই রাজ্যের মানুষ, কেন নিজের হকের চাকরির জন্য দিনের পর দিন আন্দোলন করে যেতে হবে ছেলেমেয়েগুলোকে? এই উত্তর হয়ত কোনওদিনই মিলবে না।





