সম্প্রীতির ছবি! মুসলিম মৃৎশিল্পীদের হাতের ছোঁয়াতেই যেন প্রাণ পেলেন মা কালী, সেজে উঠলেন রুবিনাদের তুলির টানে!

চারিদিকে যখন হিংসা-বিদ্বেষ, বিভেদের ছবি ভেসে উঠছে, সেই সময় দাঁড়িয়ে এই বাংলাতেই দেখা গেল এক সম্প্রীতির ছবি। মুসলিম মৃৎশিল্পীদের হাতে প্রাণ পেলেন মা কালী। রুবিনা, সুজাতাদের তুলির টানে যেন আরও জীবন্ত মাতৃপ্রতিমা।  

পাঁশকুড়ার খণ্ডখোলা গ্রামের অন্তর্গত কেশববাড় এলাকা। সেই গ্রামেরই চিত্রকর পাড়ায় থাকেন ১০-১২টি পরিবার। সেই পরিবারের রুবিনা চিত্রকর, তাপস চিত্রকর, সুজাতা চিত্রকর মুসলিম হলেও, তারা কিন্তু বংশ পরম্পরায় হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি গড়েই জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন। নামের শেষে চিত্রকর শুনে খানিক হতবাক হতে হলেও, তারা যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে গ্রামীণ লোকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, সেই কারণে তাদের পদবী চিত্রকর হয়ে গিয়েছে।    

অর্থ উপার্জনের জন্য যখন বাড়ির পুরুষরা রায়পুর, টাটা, ইন্দোরের মতো নানা ভিনিরাজ্যে গিয়ে প্রতিমা গড়েন, সেই সময় বাড়ির মহিলারা গ্রামে থেকেই বিশ্বকর্মা থেকে শুরু করে মা দুর্গা, লক্ষ্মী, কালী, সরস্বতীর মূর্তি বানান প্রত্যেক বছর। এই মৃৎশিল্পীদের পূর্বপুরুষরা কাপড়ের উপর আঠা দিয়ে কাগজ লাগাতেন। আর সেই কাগজেই তুলির টান ফুটে উঠত।

সেই কাগজেই ফুটে উঠত নানান দেবদেবীর গল্পগাথা, পৌরাণিক ঘটনা, বন্যা, খরার নানান কাহিনী। পটচিত্রশিল্পী হিসেবেও এই চিত্রকরদের খ্যাতি রয়েছে খুবই। আগে চিত্রকররা সেই পটচিত্র নিয়েই পাড়ায় পাড়ায় গান শুনিয়ে সংসার চালাতেন। যদিও এখনকার দিনে সেসব আর বেশি চোখে পড়ে না। সেই কারণে এই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দারা প্রতিমা গড়ার কাজকেই বেছে নিয়েছেন জীবিকা হিসেবে।

এই প্রসঙ্গে মৃৎশিল্পী সুজাতা চিত্রকর বলেন, “ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী আমরা ইদ, মহরম পালন করি। কিন্তু আমাদের সংসার চলে হিন্দু দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করেই। কিন্তু এই পেশাও বর্তমানে সংকটের পথে। কারণ, যেভাবে প্রতিমা তৈরির সামগ্রী বা কাঁচামালের দাম বাড়ছে তাতে প্রতিমা তৈরি করে তেমন লাভ থাকছে না। তবুও বাপ-ঠাকুরদাদের পেশাকে আঁকড়ে ধরে কোনওরকমে বেঁচে থাকা। যদি সরকারি কোনও সাহায্য সহযোগিতা মেলে তাহলে খুবই উপকৃত হব আমরা”।

এই বিষয়ে খণ্ডখোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য সিদ্দিক মল্লিক বলেন, “বহু বছর ধরেই বংশপরম্পরায় এই চিত্রকর পরিবারের সদস্যরা প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। দীর্ঘকাল ধরে গ্রামীণ লোকশিল্পকলার সঙ্গে একাত্মভাবে জড়িয়ে থাকায় এই বাসিন্দাদের পারিবারিক পদবী চিত্রকর হয়ে গিয়েছে”।

RELATED Articles