রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর শুধু প্রশাসন বা রাজনৈতিক সংগঠনেই নয়, প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কমিটিতেও। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানে এখন বদলের হাওয়া বইছে। সেই আবহেই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো নৈহাটির অত্যন্ত জনপ্রিয় বড়মা মন্দির-কে ঘিরে। নবনির্বাচিত বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়-এর নির্দেশে ভেঙে দেওয়া হলো মন্দিরের পুরোনো পরিচালন কমিটি। শুধু তাই নয়, মন্দিরে বহুদিন ধরে চলা তথাকথিত ‘ভিআইপি কালচার’ নিয়েও কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই নৈহাটির রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।
জানা গিয়েছে, সম্প্রতি বড়মা মন্দির ট্রাস্টি বোর্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই বর্তমান কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আপাতত নতুন কমিটি গঠন না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো কমিটির সম্পাদক তাপস ভট্টাচার্যই দৈনন্দিন কাজ সামলাবেন বলে জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই মন্দির কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি। এতদিন কমিটির সভাপতি ছিলেন নৈহাটি পুরসভার পুরপ্রধান অশোক চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও বিদায়ী বিধায়ক সনৎ দে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরও কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিজেপির অভিযোগ ছিল, মন্দির পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই সাধারণ ভক্তদের অসুবিধা বাড়ছিল।
নতুন বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় শুরু থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, মন্দির কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। তাই নতুন কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের রাখা হবে না। তাঁর মতে, মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব মূলত সেবায়েত এবং সমাজের বিশিষ্ট মানুষের হাতেই থাকা উচিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “বড়মা সবার, কোনও দলের নয়।” নতুন কমিটিতে শিক্ষক, চিকিৎসক, সমাজের বিশিষ্ট নাগরিকদের রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি নৈহাটির পরিচিত মুখ এবং সঙ্গীতশিল্পী রাঘব চট্টোপাধ্যায়-কেও যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বিধায়ক। যদিও তিনি নিজে স্থানীয় বিধায়ক হিসেবে কমিটির চেয়ারম্যান পদে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে মন্দিরে ‘ভিআইপি কালচার’ বন্ধের সিদ্ধান্তকে ঘিরে। অভিযোগ ছিল, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তদের জন্য সাধারণ ভক্তদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। অনেকের মতে, ধর্মীয় স্থানেও রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে আলাদা সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় জানিয়ে দিয়েছেন, এবার থেকে সাধারণ নিয়মেই সবাইকে পুজো দিতে হবে। তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর মতো সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের বাদ দিলে আর কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না। এই ঘোষণার পর বহু সাধারণ ভক্ত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আধার কার্ড দেখিয়ে আগে পুজো দেওয়ার যে সুবিধা চালু ছিল, সেটি আপাতত বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন বিদায়ী কমিটির সম্পাদক।
আরও পড়ুনঃ শেষের পথে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’? বিতর্কিত এই ধারাবাহিক ঘিরে নতুন জল্পনা টলিপাড়ায়! কি বলছেন নায়ক নায়িকা?
রাজনৈতিক পালাবদলের পর নৈহাটির বড়মা মন্দিরে এই পরিবর্তনকে অনেকেই বড় বার্তা হিসেবে দেখছেন। কারণ এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এলাকার মানুষের আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে। বহু বছর ধরে এখানকার পরিচালন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠলেও এবার সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা শুরু হয়েছে বলেই মনে করছে একাংশ। নতুন কমিটি কতটা স্বচ্ছভাবে কাজ করতে পারে এবং সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি হয় কি না, এখন সেটাই দেখার। তবে আপাতত ভিআইপি সংস্কৃতি বন্ধ এবং সাধারণ ভক্তদের গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণায় নৈহাটির বড়মা মন্দিরকে ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।






