দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিপুল সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক নানা ইস্যুতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজ্যজুড়ে। সেই আবহেই ফের সামনে উঠে এল বহুচর্চিত ‘মেসি কান্ড’। ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর কলকাতায় ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি (Lionel Messi)-র আগমন ঘিরে যে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, সরকার বদলের পর সেই ঘটনাকে ঘিরেই বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আনলেন অনুষ্ঠানের ইভেন্ট ম্যানেজার শতদ্রু দত্ত। এতদিন নীরব থাকার পর এবার তিনি সরাসরি তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।
কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসির আগমন ঘিরে সেই সময় হাজার হাজার দর্শকের ঢল নেমেছিল। কিন্তু অভিযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। টিকিট কেটে স্টেডিয়ামে ঢুকেও বহু মানুষ ঠিকমতো অনুষ্ঠান দেখতে পারেননি। গ্যালারিতে অতিরিক্ত ভিড়, বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার ঘাটতির জেরে পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ দর্শকরা চেয়ার ভাঙচুর শুরু করেন এবং স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অংশে তাণ্ডব চালান। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, মেসি মাত্র ২২ মিনিটের মধ্যেই অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। পরে এই ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও কলকাতার ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সরকার বদলের পর এবার সেই ঘটনার নেপথ্যের একাধিক তথ্য সামনে আনলেন শতদ্রু দত্ত। তাঁর অভিযোগ, অরূপ বিশ্বাস গোটা ইভেন্টের উপর অযথা প্রভাব খাটিয়েছিলেন। শতদ্রুর কথায়, “মেসিকে যেন পাড়ার পল্টু মনে করে জড়িয়ে ধরা হচ্ছিল।” তিনি দাবি করেছেন, মেসির আরও দুটি ইভেন্ট ছিল কলকাতার পর কিন্তু এখানে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেসির ম্যানেজার দ্রুত তাঁকে নিয়ে শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। শতদ্রুর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৩৯ থেকে ৪০ কোটি টাকা ট্যাক্স এবং অন্যান্য খরচ বহন করে মেসিকে কলকাতায় এনেছিলেন। অথচ শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পুরো আয়োজনটাই ভেস্তে যায়।
সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠে এসেছে টিকিট বণ্টন নিয়ে। শতদ্রু দাবি করেছেন, অরূপ বিশ্বাস নাকি আগেভাগেই মোট টিকিটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নিজের জন্য চেয়ে বসেন। তখন তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি এত সংখ্যক টিকিট রাজনৈতিকভাবে বিলি করে দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ দর্শকদের কাছে বিক্রির জন্য কী থাকবে? এই বিষয়টি নিয়ে তিনি নাকি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে ইমেলও করেছিলেন। কিন্তু কোনও সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ তাঁর। শুধু তাই নয়, শতদ্রুর দাবি, অরূপ বিশ্বাস নিজের ঘনিষ্ঠদের ডেকে ডেকে মেসির সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, যার ফলে নিরাপত্তা আরও ভেঙে পড়ে। তাঁর মতে, গোটা পরিস্থিতি পরিকল্পনাহীন এবং জোরজবরদস্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল।
এই ঘটনার তদন্তে সেই সময় SIT গঠন করা হয় এবং পরে আয়োজক শতদ্রু দত্তকেই গ্রেফতার করা হয়। টিকিট বিক্রি নিয়ে প্রায় ১৯ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও ওঠে। যদিও এখন শতদ্রুর দাবি, তাঁকে একপ্রকার বলির পাঁঠা বানানো হয়েছিল। তিনি জানিয়েছেন, একইভাবে তিনি হায়দ্রাবাদেও বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট পরিচালনা করেছেন, সেখানে কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ‘গায়ের জোর’ দেখানোর সংস্কৃতির কারণেই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তাঁর কথায়, “যেভাবে জোর করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে, তাতেই বাংলার বদনাম হয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে।”
আরও পড়ুনঃ “সব মনে রেখেছি, এবার মামলা তুলব” বিজেপির জয়ী আইনজীবী হুঁশিয়ারি তরুণজ্যোতি তিওয়ারির! ভোট মিটতেই পুরনো খুলছে ফাইল! বনগাঁ বিতর্কে ফের অস্বস্তিতে মিমি চক্রবর্তী?
ঘটনার পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজেও প্রকাশ্যে আক্ষেপ করেছিলেন যে এই ঘটনায় বাংলার ক্রীড়াঙ্গন লজ্জিত হয়েছে। তিনি তদন্তের নির্দেশও দিয়েছিলেন। তবে সরকার বদলের পর ফের নতুন করে এই ইস্যু রাজনৈতিক মহলে চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। শতদ্রু দত্ত এখন সিআইডি তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেছেন, সত্যিটা সামনে আসা উচিত। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক মানের একটি অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নষ্ট করা হয়েছে এবং সেই কারণেই গোটা বিশ্বের সামনে বাংলার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।






‘ভগবান শুধু আশা দেন, কাজ কিছুই করেন না!’ ঈশ্বরকে নিয়ে বিস্ফো’রক জাভেদ আখতার